দেশের রপ্তানি খাতে এক মাসের স্বস্তির পর আবারও নেতিবাচক প্রবণতা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিনের মন্দাভাব কাটিয়ে চলতি বছরের এপ্রিলে রপ্তানি আয় প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরলেও মে মাসে সেই গতি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। বরং গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দেশের রপ্তানি আয় প্রায় ৭ শতাংশ কমে গেছে, যা অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি এই খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
বুধবার প্রকাশিত রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)-এর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশ থেকে মোট ৪৪০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের মে মাসে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৪৭৩ কোটি ৭৯ লাখ ডলার। সেই হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় প্রায় ৭ শতাংশ কমেছে।
দেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস তৈরি পোশাক খাতেও উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে। মে মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ কমে ৩৫৯ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। যেহেতু বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগই আসে পোশাক শিল্প থেকে, তাই এই খাতের দুর্বলতা সামগ্রিক রপ্তানি আয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ১১ মাসের সামগ্রিক চিত্রও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। এই সময়ে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ধীরগতি দেখা দেওয়ায় দেশের মোট রপ্তানি আয় প্রায় আড়াই শতাংশ কমেছে। অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে মোট রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩৮০ কোটি ডলার।
এর আগে টানা আট মাস দেশের রপ্তানি খাত নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মধ্যে ছিল। সেই দীর্ঘ মন্দা কাটিয়ে ২০২৬ সালের এপ্রিলে রপ্তানি আয়ে কিছুটা উন্নতি দেখা যায়। ফলে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং রপ্তানিকারকদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল যে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য কার্যক্রমে গতি ফেরার মাধ্যমে খাতটি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াবে।
তবে মে মাসের সর্বশেষ পরিসংখ্যান সেই আশাবাদে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে চাহিদার ওঠানামা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিবেশের পরিবর্তন এবং তৈরি পোশাক খাতে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার মতো নানা কারণ রপ্তানি আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পোশাক খাতে এই নেতিবাচক প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয় আরও চাপে পড়তে পারে। কারণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে রপ্তানি খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এ পরিস্থিতিতে রপ্তানি আয় পুনরুদ্ধার এবং প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনাকে সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও নীতিনির্ধারণের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, বাজার বহুমুখীকরণ, নতুন ক্রেতা আকর্ষণ, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা ধরে রাখার উদ্যোগ আরও জোরদার করতে হবে।
এপ্রিল মাসে সাময়িক উন্নতির পর মে মাসে আবার রপ্তানি আয়ের পতন স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করছে যে দেশের রপ্তানি খাত এখনও স্থিতিশীল পুনরুদ্ধারের পথে পুরোপুরি ফিরতে পারেনি। তাই আগামী মাসগুলোতে রপ্তানি পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতি কেমন হয়, সেদিকে ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং নীতিনির্ধারকদের বিশেষ নজর থাকবে।
Geopulse TV
