বৃষ্টি নেই, পানিও নেই! খুলনার উপকূলে তীব্র সংকট, নিরাপদ পানির জন্য দুর্ভোগে লাখো মানুষ

খুলনার উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট দিন দিন আরও তীব্র হয়ে উঠছে। বৃষ্টিপাতের ঘাটতি, জলাধার নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়ার কারণে কয়রা, পাইকগাছা, বটিয়াঘাটা ও দাকোপ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ বিশুদ্ধ পানির জন্য চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন। বিশেষ করে চলমান তীব্র গরম পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে খুলনা জেলা প্রশাসন উপকূলীয় এলাকার এই পানিসংকটের বিষয়টি তুলে ধরে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সুন্দরবনসংলগ্ন শিবসা, ভৈরব, হাড়িয়া, কাজিবাছা, কপোতাক্ষ, শৈলমারী, হরিভদ্রা ও আত্রাই নদী ক্রমশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক মিঠাপানির উৎসগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উপকূলীয় এলাকায় বাগদা চিংড়ি চাষের বিস্তার, যার ফলে লবণাক্ততার মাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে পানির সংকট আরও গভীর হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে পাইকগাছা উপজেলার গড়ইখালী, সোলাদানা, দেলুটি, লস্কর, হরিঢালী, লতা ও চাঁদখালী ইউনিয়ন। এছাড়া বটিয়াঘাটার সুরখালী, জলমা ও বটিয়াঘাটা ইউনিয়ন এবং কয়রা উপজেলার আমাদী ও বাগালি ইউনিয়নের বাসিন্দারাও তীব্র সংকটের মুখোমুখি।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, চলতি বছরের মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত প্রত্যাশিত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় এসব অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর উল্লেখযোগ্য হারে নিচে নেমে গেছে। ফলে অনেক স্থানে গভীর নলকূপ থেকেও পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে না।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর-এর খুলনা কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী সুমন কুমার রায় জানিয়েছেন, কয়রার আমাদী, বাগালি ও মহারাজপুর ইউনিয়নে স্থাপিত অনেক গভীর নলকূপ কার্যকর হয়নি। উত্তর ও দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নে মাত্র ২০ শতাংশ গভীর নলকূপে পানি পাওয়া গেছে। তবে যে পানি পাওয়া যাচ্ছে, তারও একটি বড় অংশ লবণাক্ত।

তিনি বলেন, এ কারণে অধিকাংশ পরিবার এখন বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ওপর নির্ভরশীল। তবে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

দাকোপ উপজেলার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জানান, তিলডাঙ্গা, পানখালী, সুতারখালী, কামারখোলা, লাউডোব, কৈলাশগঞ্জ ও বানিশান্তা ইউনিয়নের মানুষ বছরের প্রায় আট মাস নিরাপদ পানির সংকটে ভোগেন। এই সমস্যা সমাধানে প্রায় এক দশক আগে ৪০ হাজার পানি সংরক্ষণ ট্যাংক বিতরণ করা হয়েছিল। তবে বাজুয়া ও দাকোপ ইউনিয়নে গভীর নলকূপ স্থাপনের উদ্যোগ তুলনামূলকভাবে সফল হয়েছে।

বটিয়াঘাটা উপজেলার উপসহকারী প্রকৌশলী রুনা আক্তার সুমি জানান, উপজেলার তিনটি ইউনিয়নে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রায় ২৫ ফুট নিচে নেমে গেছে। একই সঙ্গে এসব এলাকায় লবণাক্ততার মাত্রাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী বলেন, শুষ্ক মৌসুমে উপজেলার প্রায় দেড় লাখ মানুষ নিরাপদ পানির সংকটে ভোগেন। বিশেষ করে শিবসা নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা কয়েক বছর ধরেই এ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। দেলুটি ও শামুকপোতা ইউনিয়নে সারা বছরই বিশুদ্ধ পানির সংকট বিদ্যমান।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়নি। এপ্রিলে মাত্র ৩৩ দশমিক ৭০ মিলিমিটার এবং মে মাসে ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। প্রত্যাশার তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আরও নিচে নেমে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে খুলনার উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে, যা স্থানীয় জনজীবন ও কৃষি ব্যবস্থার ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।

About Desk 1

Check Also

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে শান্তি বজায় রাখতে একমত বিএসএফ-বিজিবি, জোর নজরদারি ও তথ্য বিনিময়ে

ভারত ও বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকায় শান্তি, স্থিতিশীলতা ও স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় রাখতে নিজেদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *