সাধারণ পাসপোর্ট বহন করে, ডিপ্লোমেটিক প্রটোকলের আবদার জাহেদ উরের, বিরল ইতরামির নজির তথ্য উপদেষ্টার

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে নাকি দিল্লিতে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘক্ষণ আটক এমনকী হেনস্থাও করা হয়েছে বলে একাধিক সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। অথচ এই ঘটনার অন্তরালে এমন কিছু ঘটনা রয়েছে, যা বেশ সন্দেহজনক। প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য উপদেষ্টার সৎ উদ্দেশ্য নিয়েও।

১৫ জুন প্রথম আলোর প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, কূটনৈতিক চিঠি দিয়ে আগে জানানোর পরও গতকাল রোববার সন্ধ্যায় ভারতের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ ‘রহস্যজনক কারণে’ প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে দিল্লিতে ঢুকতে বাধা দিয়েছে। পরে উচ্চ মহলের নির্দেশে অনুমতি দেওয়া হলেও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা দিল্লিতে না গিয়ে কলম্বো হয়ে ঢাকায় ফিরছেন। ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্র প্রথম আলোকে এ তথ্য জানিয়েছে।

এই রহস্যজনক বিষয়টি ঠিক কী? তবে তার আগে জেনে নেওয়া যাক, জাহেদ উর রহমান, দিল্লি কেন গিয়েছিলেন। ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দুই দিনের বৈঠকে অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান গতকাল রোববার সন্ধ্যায় ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। ওই বৈঠকে তাঁর বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল।

ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েন হল, হলো ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ২৩টি সদস্যরাষ্ট্রের একটি আন্তঃসরকারি সংস্থা। বাংলাদেশ ১৯৯৭ সালে এর প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সক্রিয় সদস্য হিসেবে যুক্ত রয়েছে এবং ২০২১–২০২৩ মেয়াদে সংস্থাটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছে। সংস্থার মূল লক্ষ্য, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্লু-ইকোনমি (সমুদ্র অর্থনীতি) সম্প্রসারণ, এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস নিয়ে কাজ করা ধরেই নেওয়া যায়, এই বৈঠকে সরকারের তরফে আমন্ত্রিত সদস্য, অতিথিরাই আসেন। ঠিক সেভাবেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বাংলাদেশকে। বাংলাদেশের তরফেও, এই সম্মেলনে যোগ দিতে তারেক রহমানের তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে মনোনীত করে পাঠান।

প্রশ্ন হচ্ছে, জাহেদ উর রহমান একটি সরকারি অনুষ্ঠানে এলেন অথচ ডিপ্লোমেটিক পাসপোর্টের পরিবর্তে কেন, সাধারণ নাগরিক পাসপোর্ট ব্যবহার করলেন? আর এখানেই তৈরি হয় জটিলতা।

আসল কারণ হচ্ছে, গত কয়েক বছর ধরেই জাহেদ উর রহমান নিজের ইউটিউব চ্যানেলে ভারত সরকার এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে লক্ষ্য করে নানা কটূক্তি করেছিলেন। এমনকী বাংলাদেশে ইউনূস সরকারের আমলে, পরে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের আমলেও ভারত বিরোধিতা, ভারতের বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং নানা ইস্যুতে ভারতকে ছোট করে বক্তব্য রাখতেন। তারপরেই তার ইউটিউব চ্যানেল ভারতে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এমনকী, তাঁকেও ইমিগ্রেশন ওয়াচলিস্টে রাখে ভারত।

১৪ জুন নয়াদিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন ওয়াচলিস্ট হিসেবেই তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। দেখা যায়, তিনি ডিপ্লোমেটিক পাসপোর্টের পরিবর্তে সাধারণ পাসপোর্ট ব্যবহার করছেন। এই বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করা হলে, জাহেদ উর রহমান অসহযোগিতা করেন।

বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন সূত্রে জানা গিয়েছে, তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে আপ্যায়ন জানানোর জন্য, সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ। যখন সাধারণ পাসপোর্ট নিয়ে সামান্য জটিলতা তৈরি হয়, তখন, পুরো সময়ই চুপ থেকেছেন তিনি। এবং যাতে জটিলতা তৈরি হয় তার জন্য তারিয়ে তারিয়ে পুরো ঘটনা উপভোগ করেছেন। সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি অনায়াসে পদক্ষেপ করতে পারতেন। কিন্তু অভিযোগ, তিনি সারাক্ষণ চুপই ছিলেন। এখানেও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও কেন পদক্ষেপ করলেন না? তাহলে কি জাহেদ উর রহমানের সঙ্গে আগে থেকেই কোনও পরিকল্পনা করা হয়েছিল?

যদিও কিঞ্চিত জিজ্ঞাসাবাদ পর্বের পর, ভারতীয় ইমিগ্রেশনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নির্দেশে ‘অতিথি’ জাহেদ উর রহমানকে ক্লিয়ারেন্স দেওয়া হয়। এরপরেই শুরু হয়, আসল নাটক, তিনি সিদ্ধান্ত নেন, ভারতে না ঢুকে, শ্রীলঙ্কা হয়ে ঢাকায় ফিরবেন।

এখানে উঠছে আরও প্রশ্ন, বর্তমানে শ্রীলঙ্কা বাংলাদেশীদের জন্য ভিসামুক্ত করেননি। আগে ETA বা ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশনের জন্য অনলাইনে আবেদন করতে হয়।  তার অনুমতি পত্র আসে ইমেলে। সেই ট্রাভেল ডক্যুমেন্ট শ্রীলঙ্কার কলম্বো বিমানবন্দরে দেখানোর পরেই পাসপোর্টে একটি স্টিকার ভিসা দেওয়া হয়। প্রশ্ন হল, তাহলে কি আগে থেকেই জাহেদ উর রহমান কলম্বো যাওয়ার পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন? আর ভারতের ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স ছাড়া কলম্বো গেলেন কী করে? প্রশ্ন আরও আছে, শ্রীলঙ্কা সফরের জন্য কি তিনি বিশেষ দ্রুত সুবিধা পেতে ডিপ্লোমেটিক পাসপোর্ট ব্যবহার করেছিলেন?

অর্থাৎ, জাহেদ উর রহমানের ভারতে আসা এমনকী এমন একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে দ্রুত অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ার পিছনে কোনও মেটিকুলাস ডিজাইন কাজ করছে? কারণ তিনি বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা বলে কথা।

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম যাই বলুক একটি বিষয় তারা স্বীকার করে নিয়েছে, জাহেদ উর রহমান ভারতের এসেছিলেন সাধারণ পাসপোর্ট নিয়ে। এবং তিনি আশা করেছিলেন, তাঁকে সাধারণ পাসপোর্টেই ডিপ্লোমেটিক প্রটোকল দেওয়া হোক। যা বিশ্বের কোনও দেশে এমনটা হয় না। তাহলে জাহেদ উর রহমানের এমন আবদার কেন?  আর তার কাছে ডিপ্লোমেটিক পাস্পোর্ট থাকলেও, তা দেখালেন না কেন? কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছে, এমন ধরণের ঘটনা বিশ্বে বিরল। আর তাঁর এই আচরণ বিশ্বের বিরতলতম ইতরামির নিদর্শন। তাঁর উদ্দেশ্য সম্মেলনে যোগ দেওয়া ছিল না, ইচ্ছাকৃতভাবে ইস্যু খাড়া করে, সরকারি ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে দিল্লির বুকে জাস্ট নাটক করতেই এসেছিলেন।

About Desk 1

Check Also

দীনেশ ত্রিবেদীর আংশিক বক্তব্য তুলে রাজনীতির মাঠ গরম করার খেলা শুরু করল জামাত !

‘ভারত-বাংলাদেশ এক হয়ে যাওয়া’ মন্তব্যের ব্যাখ্যা চাইলেন জামায়াত আমির, সরকারের প্রতি স্পষ্ট অবস্থান জানানোর আহ্বান …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *