ভারত ভাগের পর উপমহাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে বহু জটিল সমস্যার জন্ম হয়েছিল। বিশেষ করে বাংলা ভাগের ফলে সীমান্ত, ভূখণ্ড ও শরণার্থী সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে ভারত ও পূর্ব পাকিস্তান—বর্তমান বাংলাদেশের—সম্পর্কে প্রভাব ফেলেছে। এই সমস্যাগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল জলপাইগুড়ি জেলার বেরুবাড়ি ইউনিয়নকে ঘিরে বিতর্ক, যা পরবর্তীকালে “বেরুবাড়ি আন্দোলন” নামে ইতিহাসে পরিচিত হয়। পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধানচন্দ্র রায় এই ইস্যুতে রাজ্যের স্বার্থরক্ষায় যে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন, তা স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতীয় রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
র্যাডক্লিফ পুরস্কার ও বেরুবাড়ি বিতর্কের সূত্রপাত
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ আইনজীবী স্যার সিরিল র্যাডক্লিফ ভারত ও পাকিস্তানের সীমান্ত নির্ধারণ করেন। এই সীমারেখা “র্যাডক্লিফ লাইন” নামে পরিচিত। সীমান্ত নির্ধারণের সময় জলপাইগুড়ি জেলার বিভিন্ন থানা ভারত ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে ভাগ করা হয়। টেটুলিয়া, পঞ্চগড়, দেবীগঞ্জ ও পাটগ্রাম পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হলেও বোদা থানার উল্লেখ র্যাডক্লিফের নথিতে স্পষ্টভাবে করা হয়নি।
এই অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে পাকিস্তান দাবি তোলে যে বেরুবাড়ি ইউনিয়নের একটি অংশ পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত। যদিও প্রশাসনিকভাবে বেরুবাড়ি ইউনিয়ন দীর্ঘদিন পশ্চিমবঙ্গের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং জলপাইগুড়ি জেলার কোটওয়ালি থানার অধীনে পরিচালিত হতো। ১৯৫২ সালে পাকিস্তান প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে বেরুবাড়ির দাবি তোলে।
নেহরু-নুন চুক্তি ও বিতর্কের বিস্তার
ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত বিরোধ মেটাতে ১৯৫৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান নুন “নেহরু-নুন চুক্তি” স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তি অনুযায়ী বেরুবাড়ি ইউনিয়নের একটি অংশ পাকিস্তানকে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়।
মোট ৮.৭৫ বর্গমাইল আয়তনের এই অঞ্চলে প্রায় ১২ হাজার মানুষের বাস ছিল, যাদের মধ্যে মুসলমান ছিলেন মাত্র ১০০ জনের মতো। বেরুবাড়ির অর্ধেক অংশ পাকিস্তানের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসতেই পশ্চিমবঙ্গজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
১৯৫৮ সালের ১৫ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় এই ইস্যুতে বিরোধী সদস্যরা চারটি মুলতবি প্রস্তাব আনেন। জ্যোতি বসু, দেবেন সেন, হেমন্ত বসু ও অপূর্বলাল মজুমদারের মতো নেতারা বিধানসভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনার দাবি জানান।
ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের অবস্থান
কংগ্রেস সরকার প্রথমে এই বিষয়ে নীরব কৌশল গ্রহণ করলেও ডা. বিধানচন্দ্র রায় দ্রুত পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী নেহরুর সঙ্গে যোগাযোগ করে তিনি জানতে চান, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রাজস্ব আধিকারিকদের মতামতের ভিত্তিতে কি এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জওহরলাল নেহরু টেলিগ্রামে স্পষ্ট করেন যে বেরুবাড়ি হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রাজস্ব আধিকারিকদের মতামতের ভিত্তিতে হয়নি। পরে বিধানচন্দ্র রায় বিধানসভায় জানান, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিব এস. এন. রায় এবং ভূমি নথি বিভাগের পরিচালক রঘু বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লিতে উপস্থিত থাকলেও তাঁদের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনও ক্ষমতা ছিল না।
ডা. রায় স্পষ্ট ভাষায় বলেন, বেরুবাড়ি ভাগের সিদ্ধান্ত “সম্পূর্ণভাবে প্রধানমন্ত্রী স্তরে নেওয়া হয়েছিল” এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পরামর্শে নয়।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ঐতিহাসিক প্রস্তাব
১৯৫৮ সালের ২০ ডিসেম্বর বিধানসভায় একটি সর্বসম্মত প্রস্তাব গৃহীত হয়। ডা. বিধানচন্দ্র রায় এবং বিরোধী নেতা জ্যোতি বসুর যৌথ উদ্যোগে এই প্রস্তাবের খসড়া তৈরি হয়েছিল।
প্রস্তাবে বলা হয়, বেরুবাড়ি ইউনিয়ন দীর্ঘদিন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বৈধ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং এর কোনও অংশ পূর্ব পাকিস্তানকে দিলে স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক জীবন ও নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিধানসভা সর্বসম্মতভাবে দাবি জানায়, বেরুবাড়ি ভারতের অংশ হিসেবেই থাকতে হবে।
ডা. রায় বিধানসভায় বলেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার ওই অঞ্চলে রাস্তা, সেতু নির্মাণ ও উদ্বাস্তু পুনর্বাসনে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে। ফলে বেরুবাড়িকে পশ্চিমবঙ্গের অংশ হিসেবেই রাখা প্রয়োজন।
উদ্বাস্তু সমস্যা ও জনরোষ
বেরুবাড়ির প্রায় ছয় হাজার মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে পড়তে পারেন—এই আশঙ্কা আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তোলে। কারণ ওই এলাকার বহু বাসিন্দাই পূর্ববঙ্গ থেকে আসা উদ্বাস্তু ছিলেন। নতুন করে তাঁদের বাস্তুচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়।
১৯৫৯ সালের ২২ মার্চ সীমান্তবর্তী মানিকগঞ্জে একটি জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার মানুষ অংশ নেন। সম্মেলনের সভাপতি ছিলেন হিন্দু মহাসভার নেতা নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি “নেহরু-নুন চুক্তি”-কে ১৯৩৮ সালের “মিউনিখ চুক্তি”-র সঙ্গে তুলনা করেন।
পরবর্তীকালে জনসংঘের সাধারণ সম্পাদক দীনদয়াল উপাধ্যায়ও সর্বভারতীয় আন্দোলনের ডাক দেন।
বেরুবাড়ি প্রতিরক্ষা কমিটির আন্দোলন
১৯৫৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর “বেরুবাড়ি প্রতিরক্ষা কমিটি” গঠিত হয়। সতীশ রায় প্রধান, সুধাংশু মজুমদার, নির্মল বসু, অমর রায় প্রধান ও ধরনীমোহন রায়ের মতো স্থানীয় নেতারা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।
১৯৬১ সালের ২৬ জানুয়ারি, ভারতের দশম প্রজাতন্ত্র দিবসে দক্ষিণ বেরুবাড়িতে প্রায় ১২ হাজার মানুষ সমবেত হয়ে শপথ নেন—“রক্ত দেব, প্রাণ দেব, বেরুবাড়ি ছাড়ব না।” আন্দোলনকারীরা নিজেদের রক্ত দিয়ে স্বাক্ষরও করেন।
সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়
বেরুবাড়ি হস্তান্তরের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করেন নির্মল বসু। মামলার শুনানিতে কেন্দ্রীয় সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেল এম. সি. সেতলবাদ যুক্তি দেন, এটি শুধুমাত্র সীমান্ত পরিবর্তনের বিষয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের অ্যাডভোকেট জেনারেল এস. এম. বসু বলেন, ভারতের ভূখণ্ড বিদেশকে দিতে হলে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন।
১৯৬০ সালের ১৪ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট রায়ে জানায়, সংবিধানের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভারতের কোনও ভূখণ্ড বিদেশি রাষ্ট্রকে হস্তান্তর করা সম্ভব নয়। এজন্য সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন।
পরবর্তীতে কেন্দ্র সরকার সংবিধানের নবম সংশোধনী আনে। কিন্তু প্রবল গণআন্দোলন, রাজনৈতিক চাপ এবং ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের অবনতির কারণে বেরুবাড়ি হস্তান্তরের বিষয়টি আর কার্যকর হয়নি।
উপসংহার
বেরুবাড়ি আন্দোলন শুধুমাত্র সীমান্ত বিরোধ ছিল না; এটি ছিল পশ্চিমবঙ্গের আঞ্চলিক স্বার্থ, উদ্বাস্তু মানুষের নিরাপত্তা এবং সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্ন। ডা. বিধানচন্দ্র রায় এই আন্দোলনে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন।
তিনি প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে দ্বিধা করেননি। পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থরক্ষায় তাঁর এই সাহসী ভূমিকা আজও রাজনৈতিক ইতিহাসে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
Geopulse TV
