৫১২ শিশুর কবরের উপর কি উড়বে JF-17?

বাংলাদেশের সামনে আজ একটি নির্মম প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে। রাষ্ট্রের অর্থ কি শিশুদের জীবন বাঁচাতে ব্যয় হবে, নাকি যুদ্ধবিমান কিনতে?

গত কয়েক মাসে হাম ও হামের উপসর্গে ৫১২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডগুলোতে এখনও অসংখ্য পরিবার উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে এত শিশুর মৃত্যু শুধু স্বাস্থ্য খাতের ব্যর্থতার প্রশ্ন তোলে না, এটি রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

ঠিক এই সময়ে বাংলাদেশের আকাশে নতুন যুদ্ধবিমান আনার আলোচনা চলছে।

পাকিস্তান ও চীনের যৌথ উদ্যোগে তৈরি JF-17 Block III যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাব্য পরিকল্পনা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ১৬ থেকে ৪৮টি বিমান কিনতে বাংলাদেশের ব্যয় হতে পারে ৪০০ থেকে ৭২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

বাংলাদেশি মুদ্রায় যা কয়েক হাজার কোটি টাকার সমান।

প্রশ্ন হলো, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কী ? একদিকে শিশুর মৃত্যু। অন্যদিকে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ।

জাতিসংঘ-সমর্থিত Global Report on Food Crises অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে প্রায় ১.৬ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার মধ্যে ছিল। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ খাদ্য অনিরাপত্তার ঝুঁকিতে রয়েছে। একইসঙ্গে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা মূল্যস্ফীতি, জলবায়ু ঝুঁকি ও অর্থনৈতিক চাপকে উদ্বেগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করছে।

অর্থাৎ দেশের বাস্তবতা হলো—

হাসপাতালে সংকট আছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আছে। মূল্যস্ফীতির চাপ আছে।

বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ আছে। কিন্তু তারপরও যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনা এগিয়ে চলছে।

অবশ্যই একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন নিয়েও যৌক্তিক আলোচনা হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—কোন সময়ে, কোন অগ্রাধিকারে এবং কোন মূল্যে?

কারণ যুদ্ধবিমান কেনা মানে শুধু বিমান কেনা নয়।

এর সঙ্গে জড়িত থাকে অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ, সফটওয়্যার আপডেট এবং দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক নির্ভরতা। আর এই নির্ভরতা তৈরি হবে মূলত পাকিস্তান ও চীনের সামরিক শিল্পের ওপর।

এখানেই বিষয়টি শুধু সামরিক নয়, রাজনৈতিকও।

১৯৭১ সালের পর প্রথমবারের মতো পাকিস্তানি সামরিক বিমানচালনা-সংক্রান্ত সরঞ্জাম বাংলাদেশে এসেছে। ফলে এই চুক্তি শুধুমাত্র প্রতিরক্ষা ক্রয় নয়; এটি একটি প্রতীকী ও কৌশলগত বার্তাও বহন করে।

জনগণের করের অর্থ দিয়ে যদি এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, তাহলে সেই অর্থের একটি অংশ সরাসরি পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা শিল্পের কাছেও যাবে।

তাই জনগণের প্রশ্ন করার অধিকার রয়েছে।

যে দেশে শত শত শিশু হামে মারা যায়, সেখানে হাজার হাজার কোটি টাকা যুদ্ধবিমানে ব্যয় করা কতটা যৌক্তিক?

যে দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করছে, সেখানে কি প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত যুদ্ধবিমান?

যে দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা এখনও প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে, সেখানে কি আরও হাসপাতাল, আরও টিকাদান কর্মসূচি এবং আরও শিশুস্বাস্থ্য বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই?

সরকার যদি মনে করে JF-17 বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে অপরিহার্য, তাহলে জনগণের সামনে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা উচিত।

কত টাকা ব্যয় হবে? ঋণের শর্ত কী? দীর্ঘমেয়াদে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কত?

বাংলাদেশ কী প্রযুক্তিগত সুবিধা পাবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।

কারণ একটি যুদ্ধবিমান আকাশে উড়ে।

কিন্তু তার বিল পরিশোধ করে সাধারণ মানুষ।

আর ৫১২টি শিশুর মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি শুধু তার যুদ্ধবিমানে নয়, তার শিশুদের বেঁচে থাকার সক্ষমতায়ও মাপা হয়।

About Desk 1

Check Also

সীমান্ত রাজনীতি, ফেক নিউজ ও ভূরাজনৈতিক ছায়াযুদ্ধ: বাংলাদেশ কোন পথে ?

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক। ভাষা, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ এবং ভৌগোলিক …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *