ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক। ভাষা, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ এবং ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে দুই দেশের সম্পর্ক বহুস্তরীয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাবকে ঘিরে নতুন এক রাজনৈতিক ও তথ্যযুদ্ধ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সীমান্ত রাজনীতি, কাঁটাতারের বেড়া, চোরাচালান, সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং বিদেশি গোয়েন্দা সক্রিয়তার অভিযোগ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন অনেক বেশি জটিল।
ভারত দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ সীমান্তকে নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বলে মনে করে। অবৈধ অনুপ্রবেশ, অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান, জাল মুদ্রা এবং সীমান্তভিত্তিক অপরাধ ঠেকাতে দিল্লি সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার করছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের যুক্তি, এটি মূলত তাদের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার অংশ। কিন্তু বাংলাদেশের কিছু রাজনৈতিক ও ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠী এই পদক্ষেপকে “বাংলাদেশবিরোধী অবস্থান” হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সহযোগী কিছু রাজনৈতিক ও অনলাইন নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে, তারা সীমান্ত ইস্যুকে আবেগী জাতীয়তাবাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই সীমান্ত সংঘর্ষ, বিএসএফের গুলি, কিংবা কথিত “ভারতের আগ্রাসন” নিয়ে যাচাইহীন ভিডিও ও ফেক নিউজ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর অনেকগুলো পরবর্তীতে বিভ্রান্তিকর বা সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু ততক্ষণে জনমনে ক্ষোভ ও অবিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে সম্প্রতি প্রকাশিত জিও পাল্সের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। সেখানে দাবি করা হয়েছে, ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো স্থানীয় অ্যাসেট বা প্রভাববলয় তৈরি করার চেষ্টা করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী দরিদ্র মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, এমনকি স্থানীয় ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতাদেরও নানা প্রলোভনের মাধ্যমে ব্যবহার করা হতে পারে। অভিযোগ রয়েছে, এসব নেটওয়ার্ক সীমান্ত নজরদারি, চোরাচালান রুট, নিরাপত্তা মোতায়েন এবং জনমত প্রভাবিত করার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, সীমান্ত এলাকায় তথাকথিত “লোকাল অ্যাসেট স্ট্যাবিলাইজেশন প্রোগ্রাম” নামে একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে হাজারো স্থানীয় ব্যক্তিকে ব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। সেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষুদ্র ইনফ্লুয়েন্সারদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ আছে। যদিও এই নথির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবুও এমন অভিযোগ ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো—দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনকে যদি বিদেশি শক্তি বা চরমপন্থী গোষ্ঠী কাজে লাগাতে শুরু করে, তাহলে তা শুধু ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নয়, বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারে। কারণ সীমান্ত রাজনীতি কখনো শুধু সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি ধীরে ধীরে অর্থনীতি, কূটনীতি, ধর্মীয় মেরুকরণ এবং জাতীয় নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলে।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব একমাত্রিক নয়। তিস্তা পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য বৈষম্য বা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের ভূমিকা নিয়ে বাস্তব কিছু ক্ষোভ রয়েছে। কিন্তু সেই ক্ষোভকে যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উগ্র জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় মেরুকরণ বা ফেক নিউজের মাধ্যমে উসকে দেওয়া হয়, তাহলে তা গণতান্ত্রিক আলোচনা থেকে সরে গিয়ে বিপজ্জনক জনমত তৈরির অস্ত্রে পরিণত হয়।
আজকের তথ্যযুদ্ধের যুগে সীমান্তে শুধু সেনা বা কাঁটাতারই মোতায়েন হয় না; মোতায়েন হয় ডিজিটাল প্রচারণা, বট নেটওয়ার্ক, ভুয়া ভিডিও এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব অপারেশনও। ফলে বাংলাদেশের রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের দায়িত্ব হচ্ছে যাচাইহীন তথ্যের বিরুদ্ধে সচেতন থাকা এবং ভূরাজনৈতিক খেলায় নিজেদেরকে ব্যবহৃত হতে না দেওয়া।
দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক লাভের জন্য সীমান্ত ইস্যুকে উত্তেজনার অস্ত্রে পরিণত করা হলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে দুই দেশের সাধারণ মানুষই।
Geopulse TV
