সমুদ্র-রাজনীতির বিশ্বমঞ্চে ভারত: ITLOS-এ ভারতের আইনি কূটনীতির নতুন জয়জোয়ার

আন্তর্জাতিক সমুদ্র রাজনীতি এবং আইনি কূটনীতির আঙিনায় ভারতের জন্য একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা হলো। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন সংক্রান্ত সর্বোচ্চ ও অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ‘ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ল অব দ্য সি’ (ITLOS)-এর বিচারপতি হিসেবে ২০২৬ থেকে ২০৩৫ সালের মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন ভারতের বিশিষ্ট আইনজ্ঞ অধ্যাপক বিমল এন. প্যাটেল। এই জয় কেবল একজন ব্যক্তিসত্তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নয়, বরং বৈশ্বিক সমুদ্র শাসন (Global Maritime Governance) এবং নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা (Rules-based International Order) সুনিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ভারতের ক্রমবর্ধমান শক্তির এক অকাট্য প্রমাণ। নয়াদিল্লির এই কূটনৈতিক সাফল্যকে স্বাগত জানিয়ে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন, তা আসলে বিশ্বমঞ্চে ভারতের প্রতি রাষ্ট্রজোটের গভীর আস্থারই প্রতিফলন।

সমুদ্র কূটনীতির রূপান্তর ও ‘ইউএনসিএলওএস’-এর প্রাসঙ্গিকতা

১৯৮২ সালের ‘জাতিসংঘের সমুদ্র আইন বিষয়ক কনভেনশন’ (UNCLOS)-এর অধীনে প্রতিষ্ঠিত ‘আইটিএলওএস’ বা ITLOS সমুদ্রসীমা নির্ধারণ, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা, একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল (EEZ)-এর অধিকার রক্ষা এবং সামুদ্রিক পরিবেশের সুরক্ষায় এক চূড়ান্ত সালিশি সভা হিসেবে কাজ করে। বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে, বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক বা ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যেখানে শক্তির ভারসাম্য প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে, সেখানে এই ট্রাইব্যুনালের গুরুত্ব অপরিসীম।

বিগত দশকগুলিতে ভারত তার সামুদ্রিক নীতিতে এক আমূল পরিবর্তন এনেছে। ‘লুক ইস্ট’ নীতি থেকে ‘অ্যাক্ট ইস্ট’, এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দূরদর্শী ‘সাগর’ (SAGAR – Security and Growth for All in the Region) দর্শনের মাধ্যমে ভারত নিজেকে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের এক মূল নিরাপত্তা প্রদানকারী (Net Security Provider) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে, ট্রাইব্যুনালে একজন ভারতীয় বিচারপতির উপস্থিতি ভারতের এই নীতিগত অবস্থানকে এক আইনি আইডেন্টিটি বা বৈধতা প্রদান করবে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ভারতের আন্তর্জাতিক আইনি দায়বদ্ধতা

আন্তর্জাতিক আইন ও সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে ভারতের ট্র্যাক রেকর্ড সবসময়ই অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন এবং অনুকরণীয়। ২০১৪ সালের একটি ঐতিহাসিক ঘটনার কথা এখানে স্মরণ করা যেতে পারে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রসীমা নির্ধারণ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের নিষ্পত্তি ঘটেছিল হেগের স্থায়ী সালিশি আদালতের (PCA) মাধ্যমে। সেই রায়ে ভারতের কিছু প্রতিকূলতা থাকলেও, নয়াদিল্লি অত্যন্ত পরিপক্ক ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের মতো আন্তর্জাতিক আদালতের সেই রায়কে বিনাদ্বিধায় মেনে নিয়েছিল।

একইভাবে, ইতালীয় নৌসেনাদের (Enrica Lexie case) মামলাতেও ভারত আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়াকে মান্যতা দিয়েছে। ভারতের এই ‘আইনের শাসনের প্রতি দায়বদ্ধতা’ আজ বৈশ্বিক স্তরে প্রশংসিত। যখন বিশ্বের কিছু পরাশক্তি আন্তর্জাতিক আদালতের রায়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দক্ষিণ চিন সাগরে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে মত্ত, ঠিক তখন ভারতের এই ইতিবাচক ভূমিকা অধ্যাপক বিমল প্যাটেলের জয়কে আরও ত্বরান্বিত করেছে।

ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত ও আইটিএলওএস-এর মঞ্চে ভারত

বর্তমান বিশ্ব এক তীব্র সামুদ্রিক প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ চিন সাগরে চিনের ‘নাইন-ড্যাশ লাইন’ বিতর্ক, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের সঙ্গে ক্রমাগত সংঘাত এবং তাইওয়ান প্রণালীতে উত্তেজনা আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনকে এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। অন্যদিকে, লোহিত সাগর বা বাব-আল-মান্দেব প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ড্রোন হামলা বিশ্ব বাণিজ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলকে (Supply Chain) বিঘ্নিত করছে।

এই উত্তাল সময়ে, অধ্যাপক বিমল প্যাটেলের মতো একজন অভিজ্ঞ আইনবিদের আইটিএলওএস-এ অন্তর্ভুক্তি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক আইন, সংবিধান এবং বৈশ্বিক শাসন বিষয়ে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এক ভারসাম্যপূর্ণ এবং নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসবে। সমুদ্রপথের অবাধ স্বাধীনতা (Freedom of Navigation) এবং নির্বিঘ্ন সামুদ্রিক বাণিজ্য নিশ্চিত করতে ভারত যে নীতিগত লড়াই লড়ছে, তা এই নির্বাচনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরও জোরালো হবে।

ভারত মহাসাগরের চ্যালেঞ্জ ও আঞ্চলিক নেতৃত্ব

বিশ্ব বাণিজ্যের লাইফলাইন বা জীবনরেখা হলো ভারত মহাসাগর। এই অঞ্চলের মালাক্কা প্রণালী বা হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ ‘চোক পয়েন্ট’ দিয়ে প্রতিদিন কোটি কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়। তবে এই অঞ্চলটি এখন অবৈধ, অনিয়ন্ত্রিত ও অনুল্লিখিত মৎস্য শিকার (IUU Fishing), জলদস্যুতা, মানব পাচার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো একাধিক সংকটে জর্জরিত।

ভারত মহাসাগরীয় রিম অ্যাসোসিয়েশন (IORA) এবং ‘কোয়াড’ (QUAD)-এর মতো বহুপাক্ষিক জোটের মাধ্যমে ভারত দীর্ঘদিন ধরে এই সংকটগুলির মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে। এখন, আইটিএলওএস-এর বেঞ্চে ভারতের প্রতিনিধিত্ব থাকার ফলে, আঞ্চলিক দেশগুলির সামুদ্রিক বিরোধ বা পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত আইনি বিতর্কে ভারত এক অনুঘটকের ভূমিকা পালন করতে পারবে। এটি ব্লু ইকোনমি বা নীল অর্থনীতির টেকসই বিকাশের ক্ষেত্রেও ভারতের অবস্থানকে শক্ত করবে।

উপসংহার: এক নতুন যুগের সূচনা

অধ্যাপক বিমল এন. প্যাটেলের এই গৌরবময় জয় কেবল ভারতের আইনি মহলের একার সাফল্য নয়; এটি ভারতের সামগ্রিক পররাষ্ট্রনীতি ও সামুদ্রিক কূটনীতির এক মহতী বিজয়। ২০২৬ থেকে ২০৩৫—আগামী এই দশ বছর বিশ্ব রাজনীতিতে সামুদ্রিক সুরক্ষার সমীকরণ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।

এই দীর্ঘ মেয়াদে আইটিএলওএস-এর বিচারক হিসেবে ভারতের এই উজ্জ্বল উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, বিশ্বমঞ্চে ভারত আজ আর কেবল নিয়মের অনুসারী (Rule Follower) নয়, বরং সে আজ আন্তর্জাতিক নিয়ম রচয়িতা (Rule Maker) হিসেবে নিজের স্থান পাকা করে নিয়েছে। এই ঐতিহাসিক নির্বাচন আগামী দিনে একটি উন্মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং আইনসম্মত সামুদ্রিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে ভারতকে এক নতুন দিশা দেখাবে—এ বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।

About Desk 1

Check Also

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের অশনি ইঙ্গিত, কী চাইছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট? কেন জড়াতে বাধ্য হচ্ছে পশ্চিমী দুনিয়া!

সম্পাদকীয়- বিশ্ব রাজনীতির ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এক নতুন কৌশলগত পথে হাঁটতে শুরু করেছে। মার্কিন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *