আত্মনির্ভর ভারত: অস্ত্রের কারখানা থেকে বিশ্বশক্তির পথে

২০৪৭ সালের মধ্যে ₹৮.৮ লক্ষ কোটির প্রতিরক্ষা অর্থনীতি গড়ে তোলার স্বপ্ন — সুদূর কল্পনা নয়, এটি এখন নীতি ও কর্মপরিকল্পনায় রূপ নিচ্ছে।
₹১.৫৪ লক্ষ কোটি বর্তমান উৎপাদন মূল্য
₹৩৮,৪২৪ কোটি রপ্তানি (৬২% বৃদ্ধি)
৮০+ রপ্তানি-গ্রাহক দেশ
“আধুনিক যুদ্ধ এখন আর কেবল সীমান্তে লড়া হয় না — এটি লড়া হয় স্ক্রিনে, সাইবার জগতে, এবং সমাজের মানসিকতায়।”
অপারেশন সিন্দুরের শিক্ষা
অপারেশন সিন্দুর ভারতকে একটি কঠিন সত্য শিখিয়ে দিয়েছে — আধুনিক যুদ্ধ শুরু হয় অতর্কিতে, ট্রিগার ইনসিডেন্টের মধ্য দিয়ে। এই সংঘর্ষে এবং পরবর্তী ইরান যুদ্ধে দেখা গেছে, শত্রুপক্ষের লক্ষ্য ছিল কমান্ড-কন্ট্রোল নেটওয়ার্ক, বিমানঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র পরিকাঠামো, এবং প্রতিরক্ষা-শিল্প উৎপাদন কেন্দ্রগুলি। যা একসময় “পিছনের অঞ্চল” বলে গণ্য হত, তা এখন সম্মুখ সমরক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। যুক্তিটি সহজ: যদি একটি দেশ উৎপাদন করতে না পারে, মেরামত করতে না পারে বা যোগাযোগ রাখতে না পারে — সে লড়াই করতে পারবে না। কিল চেইন এখন আর রৈখিক নয়; এটি AI-সহায়তায় পরিচালিত, তথ্য-চালিত এবং প্রতিনিয়ত অভিযোজিত।
প্রতিরক্ষা উৎপাদনে ছয়গুণ লাফ
ভারত আজ বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম প্রতিরক্ষা ব্যয়কারী দেশ ($৮৬ বিলিয়ন), কিন্তু দেশীয় উৎপাদন এখনও পিছিয়ে। সেই ব্যবধান ঘোচাতে সরকার ২০৪৭ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা উৎপাদন ₹৮.৮ লক্ষ কোটিতে (প্রায় $১০৫ বিলিয়ন) নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে — বর্তমান স্তরের ছয়গুণ। রপ্তানির ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা আরও উচ্চাভিলাষী: ₹২.৮ লক্ষ কোটি ($৩৩.৬ বিলিয়ন), যা বর্তমানের প্রায় নয়গুণ। তেজস LCA, পঞ্চম প্রজন্মের AMCA স্টেলথ ফাইটার, ৬৫,০০০ টনের INS বিশাল বিমানবাহী রণতরী, জোরাওয়ার লাইট ট্যাঙ্ক, প্রজেক্ট ৭৫I সাবমেরিন এবং পারমাণবিক আক্রমণ সাবমেরিন (প্রজেক্ট ৭৭) — এই সব প্রকল্পে বিনিয়োগ চলছে পূর্ণ গতিতে।
কৌশলগত দুর্বলতা: চিনা নির্ভরতার ফাঁদ
এখানেই লুকিয়ে আছে ভারতের সবচেয়ে বড় কৌশলগত দ্বন্দ্ব। অটোমোটিভ, ইলেকট্রনিক্স, সেমিকন্ডাক্টর, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং রাসায়নিক শিল্পে প্রায় ৩০ শতাংশ উপকরণ আসে চিন থেকে — যে দেশটি ভারতের প্রধান প্রতিপক্ষ। বৈদেশিক প্ল্যাটফর্ম, সেমিকন্ডাক্টর, বিশেষ উপকরণ এবং যোগাযোগ সরঞ্জামের উপর নির্ভরতা এখন শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি সরাসরি কৌশলগত বিপদ। সমান্তরালভাবে, AI-এর কারণে ঐতিহ্যবাহী IT পরিষেবা খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সংকোচন ঘটছে। ফলে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এখন শুধু নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, এটি অর্থনৈতিক বেঁচে থাকার প্রশ্নও।
স্বায়ত্তশাসন ও প্রযুক্তি সার্বভৌমত্ব
ভারতের প্রতিরক্ষা নীতির কেন্দ্রে এখন তিনটি প্রযুক্তি ক্ষেত্র: স্বায়ত্তশাসিত সিস্টেম, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ও সাইবার সক্ষমতা, এবং অ্যারো-ইঞ্জিন উন্নয়ন। IdeaForge, Garuda Aerospace, Bharat Forge, Zen Technologies-এর মতো দেশীয় কোম্পানি ড্রোন ও লোইটারিং মিউনিশন তৈরিতে সক্রিয়। Solar Industries-এর Nagastra এই ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। AMCA প্রকল্পে Tata, L&T এবং কল্যাণী গ্রুপকে প্রোটোটাইপ নির্মাণে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ২০২৭ সালে কাঠামোগত পরীক্ষা এবং ২০২৯-৩০ সালে প্রথম পরীক্ষামূলক উড়ানের পরিকল্পনা রয়েছে। ইঞ্জিন প্রসঙ্গে, GE-র সাথে F414 ইঞ্জিন যৌথ উৎপাদনের চুক্তি চলমান এবং ৫ম প্রজন্মের AMCA ইঞ্জিনের জন্য Safran বা Rolls-Royce-এর সাথে আলোচনা চলছে।
উদ্ভাবন বাস্তুতন্ত্র ও বেসরকারি খাতের ভূমিকা
iDEX প্রকল্পের মাধ্যমে MSME, স্টার্টআপ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে সেনাবাহিনীর সুনির্দিষ্ট সমস্যার সমাধানে নিযুক্ত করা হচ্ছে। ADITI প্রকল্পে প্রতিটি কৌশলগত প্রযুক্তি স্টার্টআপকে ₹২৫ কোটি পর্যন্ত অনুদান দেওয়া হচ্ছে। DAP ২০২০ নীতিমালা অনুযায়ী মূলধন বাজেটের ৭৫ শতাংশ দেশীয় ক্রয়ে ব্যয় করা বাধ্যতামূলক। ৫,০০০-এরও বেশি পণ্য ইতিমধ্যে পজিটিভ ইন্ডিজেনাইজেশন তালিকায় (PIL) অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। গত দেড়-দুই বছরে প্রায় ₹৪.৫ লক্ষ কোটির ($৫৪ বিলিয়ন) চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার ৯০ শতাংশের বেশি দেশীয় শিল্পের সাথে। DRDO ইতিমধ্যে ২,২০০-এরও বেশি প্রযুক্তি শিল্পে হস্তান্তর করেছে।
সম্পাদকীয় মতামত
ভারতের এই প্রতিরক্ষা রূপান্তরের যাত্রা কেবল সামরিক শক্তি বৃদ্ধির গল্প নয়। এটি একটি সভ্যতার আত্মপ্রত্যয়ের ঘোষণা। ইরানের মতো অনেক কম সম্পদের দেশ যদি শিল্পীয় স্থিতিস্থাপকতার মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার টেবিলে আনতে পারে, তবে ভারতের কাছে সেই সম্ভাবনা অনেক বেশি। তবে সাফল্যের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হবে ধারাবাহিকতার অভাব এবং উদ্ভাবনের সংস্কৃতির ঘাটতি। চিনা উপকরণ নির্ভরতা কমানো, R&D বাজেট প্রতিরক্ষা বাজেটের ১৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং MSME-দের কেবল সরবরাহকারীর ভূমিকা থেকে কৌশলগত অংশীদারে পরিণত করাই এখন জাতীয় অগ্রাধিকার। ‘আত্মনির্ভর, অগ্রণী এবং অতুল্য ভারত’ — এই স্বপ্ন পূরণের পথ দীর্ঘ, কিন্তু ভিত্তি এখন আর কেবল কাগজে নয়, কর্মে পরিণত হচ্ছে।

About Desk 1

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *