সম্প্রতি ব্রিটিশ সংসদের নিম্নকক্ষ হাউজ অব কমন্সে দাঁড়িয়ে স্বতন্ত্র এমপি রূপার্ট লো (Rupert Lowe) যখন ‘গ্রুমিং গ্যাং’ বা সংগঠিত শিশু যৌন নির্যাতন চক্রের শিকার হওয়া নির্যাতিতাদের অবর্ণনীয় ও লোমহর্ষক সাক্ষ্যগুলো পড়ছিলেন, তখন কেবল সেই সংসদ কক্ষই নয়, শিউরে উঠেছিল পুরো বিশ্বের বিবেক। ব্রিটেনের অন্তত ৮৫টি এলাকায় কয়েক দশক ধরে চলা এই গ্যাং-ভিত্তিক শিশু যৌন নিপীড়নের শিকড় কতটা গভীরে, তা আজ আর কারও অজানা নয়। প্রফেসর অ্যালেক্সিস জেসির (Alexis Jay) ২০১৪ সালের বিখ্যাত রদারহ্যাম রিপোর্ট থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের রচডেল রিভিউ—প্রতিটি তদন্তেই উঠে এসেছে এক ভয়ঙ্কর সত্য।
তবে এই অপরাধের ভয়াবহতা শুধু এর সংখ্যা বা প্রশাসনিক ব্যর্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই রিপোর্টের পরতে পরতে লুকিয়ে রয়েছে অপরাধীদের এক চরম বিকৃত, পদ্ধতিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক মনস্তত্ত্ব (Criminal Psychology)। কেন এবং কীভাবে একদল মানুষ বছরের পর বছর ধরে শত শত শিশুর ওপর এমন পৈশাচিক নির্যাতন চালাতে পারে? একজন সমাজবিজ্ঞানী বা অপরাধ-মনস্তাত্ত্বিকের দৃষ্টিতে এই ‘গ্রুমিং গ্যাং’-এর অপরাধীদের মানসিক গঠন বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি অন্ধকার দিক উন্মোচিত হয়।
১. ‘অন্যকরণ’ এবং বর্ণবাদী মনস্তত্ত্ব (Racial Othering & Rationalization)
রূপার্ট লোর পেশ করা সাক্ষ্যে এক নির্যাতিতা স্পষ্টভাবে বলেছেন—অপরাধীরা মনে করত শ্বেতাঙ্গ বা খ্রিস্টান মেয়েদের কোনো নৈতিক মূল্য বা মর্যাদা নেই, যেখানে তাদের নিজস্ব সম্প্রদায়ের মেয়েরা উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় **’অন্যকরণ’ (Othering)** এবং **’যৌক্তিকীকরণ’ (Rationalization)**।
যখন কোনো অপরাধী গোষ্ঠী কোনো নির্দিষ্ট জাতি, ধর্ম বা বর্ণের মানুষকে নিজেদের চেয়ে ‘নিচু’ বা ‘মর্যাদাহীন’ বলে মনে করে, তখন তাদের মনে ভুক্তভোগীদের প্রতি কোনো সহানুভূতি কাজ করে না। অপরাধীরা তাদের এই পৈশাচিক আচরণকে ধর্মের বা সংস্কৃতির এক বিকৃত ঢাল দিয়ে জাস্টিফাই বা বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে। এই মনস্তত্ত্বের কারণেই অপরাধীরা কোনো অপরাধবোধ ছাড়াই একের পর এক শিশুকে টার্গেট করতে পেরেছে, কারণ তাদের অবচেতন মন এই শিশুদের ‘মানুষ’ হিসেবে নয়, বরং স্রেফ ভোগের বস্তু হিসেবে গণ্য করত।
২. চরম পরপীড়নকামিতা এবং ক্ষমতার প্রদর্শন (Sadism & Power Dynamics)
যৌন নির্যাতন কেবল শারীরিক লালসা মেটানোর মাধ্যম নয়, অপরাধ মনস্তত্ত্বে এটিকে দেখা হয় **ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ (Power and Control)** প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ হিসেবে। লোর আনা সাক্ষ্যে এক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, এক অপরাধী তাঁর মুখ চেপে ধরে চোখের দিকে তাকিয়ে দেখতে চেয়েছিল যে মেয়েটি কখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে।
“The man just held my face, stared me down straight in the eyes, and he wanted to see me break, and he did.”
এই প্রবৃত্তিটি হলো বিশুদ্ধ **পরপীড়নকামিতা (Sadism)**। এখানে অপরাধীর আনন্দ কেবল নির্যাতনে নয়, বরং শিকারের সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ এবং তার আত্মসম্মান চূর্ণ-বিচূর্ণ হতে দেখার মধ্যে। কুকুরের খাঁচায় বন্দি করা বা পশু দিয়ে ধর্ষণ করানোর মতো চরম বিকৃত আচরণগুলো প্রমাণ করে যে, অপরাধীরা ভুক্তভোগীদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিল, যাতে তারা পরবর্তীতে কখনোই মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে বা অভিযোগ করার সাহস না পায়।
৩. দলগত মনস্তত্ত্ব ও দায়বদ্ধতার বিভাজন (Groupthink & Diffusion of Responsibility)
এই কেলেঙ্কারিগুলোর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—এগুলো কোনো একক ব্যক্তির অপরাধ নয়, বরং দলবদ্ধ বা গ্যাং-ভিত্তিক অপরাধ। এক নির্যাতিতা জানিয়েছেন, তাঁকে তিন বছরে প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ জন পুরুষ ধর্ষণ করেছে। অন্য এক সাক্ষ্যে দেখা যায়, একটি ভ্যানের পেছনে ১৫-২০ জন মেয়েকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল এবং পুরুষরা চারপাশে দাঁড়িয়ে হাসাহাসি করছিল ও বাজি ধরছিল।
সমাজবিজ্ঞানে একে **’ডিফিউশন অব রেসপন্সিবিলিটি’ (Responsibility Diffusion)** বা দায়বদ্ধতার বিভাজন বলা হয়। যখন কোনো অপরাধ দলগতভাবে করা হয়, তখন ব্যক্তিবিশেষের নিজস্ব বিবেক বা নৈতিকতাবোধ লোপ পায়। প্রত্যেকে ভাবে, “আমি তো একা করছি না, সবাই করছে।” ফলে তাদের ব্যক্তিগত অপরাধবোধ বহুলাংশে কমে যায়। উপরন্তু, দলবদ্ধভাবে ভিডিও করা বা বাজি ধরার মতো আচরণগুলো তাদের কাছে এক ধরণের ‘সামাজিক বিনোদন’ বা ‘গ্রুপ বন্ডিং’-এ পরিণত হয়েছিল, যা তাদের এই অপরাধকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করতে সাহায্য করেছে।
[ব্যক্তিগত অপরাধবোধ] ──(দলগত মনস্তত্ত্ব)──> [দায়বদ্ধতার বিভাজন] ──> [সহিংসতার তীব্রতা বৃদ্ধি]৪. প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষাঘাত এবং অপরাধীদের মনস্তাত্ত্বিক আত্মবিশ্বাস
অপরাধীরা জানত যে তারা বছরের পর বছর ধরে এই কাজ অবাধে চালিয়ে যেতে পারবে। এর পেছনে ছিল ব্রিটেনের সরকারি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার চরম পক্ষাঘাত। প্রফেসর অ্যালেক্সিস জেসির রিপোর্টে প্রমাণিত হয়েছে যে, রদারহ্যামে ১,৪০০-র বেশি শিশু নির্যাতিত হওয়ার পরও কেবল “বর্ণবাদী” তকমা পাওয়ার ভয়ে পুলিশ ও স্থানীয় কাউন্সিল কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
প্রশাসনের এই দুর্বলতা বা রাজনৈতিকভাবে সঠিক থাকার (Political Correctness) অন্ধ মানসিকতা অপরাধীদের মনস্তাত্ত্বিক আত্মবিশ্বাসকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। তারা বুঝে গিয়েছিল যে, শিশুরা অভিযোগ করলেও সমাজ বা আইন তাদের স্পর্শ করবে না। ফলে চাইল্ড কেয়ার হোমের কর্মীদের কাজে লাগিয়ে গাড়ির হর্ন বাজিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে শিশুদের তুলে নিয়ে যাওয়ার মতো দুঃসাহস তারা দেখাতে পেরেছে।
একটি সামাজিক ব্যাধির অন্তিম পরিণতি
২০২৩ সালে ঋষি সুনাকের গঠিত চাইল্ড সেক্সুয়াল এক্সপ্লয়টেশন টাস্কফোর্সের রিপোর্টে দেখা গেছে, সে বছর ৪,২২৮টি ঘটনা ছিল গ্যাং-ভিত্তিক। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, কঠোর আইন বা শত শত গ্রেপ্তারের পরেও এই অপরাধের মানসিকতা সমাজ থেকে পুরোপুরি নির্মূল করা যায়নি।
ব্রিটেনের এই গ্রুমিং গ্যাং কেলেঙ্কারি কেবল কিছু অপরাধীর আইনের চোখে ধরা পড়ার গল্প নয়; এটি একটি সভ্য সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা পচন। অপরাধীদের এই বিকৃত মনস্তত্ত্ব—যা জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব, চরম নারীবিদ্বেষ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দলগত বর্বরতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে—তাকে উপড়ে ফেলতে হলে কেবল পুলিশি অভিযান যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক মনস্তত্ত্বের পরিবর্তন, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং যেকোনো মূল্যে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় রক্ষণশীলতার ঊর্ধ্বে উঠে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। যতক্ষণ না অপরাধীদের এই মনস্তাত্ত্বিক আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেওয়া যাচ্ছে যে “তারা পার পেয়ে যাবে”, ততক্ষণ সভ্যতার আলো ফুটলেও এই অন্ধকার গলিগুলো বন্ধ হবে না।
Geopulse TV
