সম্পাদকীয়-
বিশ্ব রাজনীতির ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এক নতুন কৌশলগত পথে হাঁটতে শুরু করেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর, অর্থাৎ Pentagon, এবার সরাসরি বেসরকারি অটোমোবাইল শিল্পকে অস্ত্র উৎপাদনে যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে। General Motors এবং Ford Motor-এর মতো বৃহৎ কোম্পানির সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শুরু হয়েছে—যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার “Arsenal of Democracy”-এর স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে।
এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য—যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র উৎপাদন ক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে কমে যাওয়া অস্ত্র মজুদ পূরণ করা।
সংঘাতের চাপ ও অস্ত্র সংকট: কেন এই সিদ্ধান্ত? বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র একাধিক আন্তর্জাতিক সংঘাতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে—বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইরান-সংক্রান্ত উত্তেজনা। এই পরিস্থিতিতে বিপুল পরিমাণ মিসাইল, ড্রোন, ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহৃত হওয়ায় অস্ত্রভান্ডার দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
Pentagon মনে করছে, শুধুমাত্র প্রচলিত প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের উপর নির্ভর করে এই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। ফলে বেসরকারি উৎপাদন ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করা এখন “জাতীয় নিরাপত্তার অগ্রাধিকার” হিসেবে দেখা হচ্ছে। এছাড়া, প্রস্তাবিত প্রায় ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেটেও অস্ত্র উৎপাদন ও ড্রোন প্রযুক্তিতে ব্যাপক বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এই পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—বেসরকারি শিল্পকে “ডুয়াল-ইউজ” বা দ্বৈত ব্যবহারের সক্ষমতায় রূপান্তর করা।
General Motors ইতিমধ্যেই একটি প্রতিরক্ষা শাখা পরিচালনা করে এবং সামরিক যান তৈরি করে। অন্যদিকে Ford Motor-এর সরাসরি প্রতিরক্ষা ইউনিট না থাকলেও তাদের উৎপাদন কাঠামো সহজেই সামরিক কাজে ব্যবহারযোগ্য বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়া GE Aerospace এবং Oshkosh-এর মতো প্রতিষ্ঠানও এই আলোচনায় যুক্ত হয়েছে, যা বোঝায় যে এটি একটি বৃহত্তর শিল্প-সমন্বয় প্রকল্প। এই মডেলটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হয়েছিল, যখন গাড়ি কারখানাগুলো যুদ্ধবিমান ও ট্যাঙ্ক উৎপাদন করত।
এর কৌশলগত লক্ষ্য: ‘ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেস’ শক্তিশালী করা। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তিনটি প্রধান লক্ষ্য অর্জন করতে চায়—১. উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি যেমন বেসরকারি শিল্পের কারখানা ও শ্রমশক্তি ব্যবহার করে দ্রুত অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানো। ২. সাপ্লাই চেইন স্থিতিশীলতা অর্থাৎ যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি কমানো। ৩. প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন: বাণিজ্যিক প্রযুক্তিকে সামরিক ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে দ্রুত আধুনিকীকরণ। এটি মূলত “whole-of-nation approach”—যেখানে পুরো অর্থনীতিকে প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির অংশ করা হচ্ছে।
এই যে ভিন্নমুখী উদ্যোগ কেবল সামরিক নয়, অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এটি মার্কিন শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি সুযোগ তৈরি করছে। দ্বিতীয়ত, এটি রাজনৈতিকভাবে একটি শক্ত বার্তা—যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি “peacetime economy” থেকে “wartime economy”-তে আংশিক রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয়।
পশ্চিমীয় যে এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে, এর প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—এটি এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। ১. চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা তীব্র হবে, এশিয়ায় সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে China-এর উপর। যুক্তরাষ্ট্র যদি দ্রুত অস্ত্র উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হয়, তাহলে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে তার সামরিক উপস্থিতি আরও শক্তিশালী হবে। এর ফলে দক্ষিণ চীন সাগর, তাইওয়ান প্রণালী ইত্যাদি অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়তে পারে। ২. ভারতসহ আঞ্চলিক শক্তির পুনর্বিন্যাস, India-এর মতো দেশগুলোর জন্য এটি দ্বিমুখী পরিস্থিতি তৈরি করবে— একদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ
অন্যদিকে, অস্ত্র প্রতিযোগিতার চাপ ভারত ইতিমধ্যেই “Make in India” উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা উৎপাদন বাড়াতে চায়—এই মার্কিন পদক্ষেপ সেই প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করবে। ৩. অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও নিরাপত্তা সংকট। এশিয়ার বহু দেশ—যেমন জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া—ইতিমধ্যেই সামরিক ব্যয় বাড়াচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ একটি “arms race” বা অস্ত্র প্রতিযোগিতা ত্বরান্বিত করতে পারে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলবে। ৪. মধ্যপ্রাচ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা। ইরান সংঘাতের প্রেক্ষিতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতায়, যা এশিয়ার জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলোর উপর চাপ বাড়লে এশিয়ার অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।-
নতুন বিশ্বব্যবস্থার ইঙ্গিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ শুধু একটি শিল্পনীতি নয়—এটি একটি বৃহত্তর কৌশলগত বার্তা। বেসরকারি শিল্পকে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ করে তোলা মানে, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমাত্রিক সংঘাতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছে। এর ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে “মিলিটারাইজেশন অফ ইকোনমি” আরও ত্বরান্বিত হতে পারে, যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে এশিয়ায়—যেখানে ইতিমধ্যেই শক্তির ভারসাম্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশ্ব এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে অর্থনীতি ও যুদ্ধ প্রস্তুতি ক্রমশ একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠছে—আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন শিল্প-সামরিক জোট।
গত কয়েক মাসে আমরা দেখেছি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তুঘলকী সিদ্ধান্তে ইউরোপের দেশগুলির সঙ্গে একটা ফাটল দেখা গিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। প্রশ্ন জাগতেই পারে, আগামী দিনে কি এই ফাটল আরও চওড়া হবে ? উত্তর হল না, কারণ যুক্তরাষ্ট্র যেমন আগামী দিনে এক বড় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে ব্রিটেনও। সময় হলেই পা মেলাবে ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলিও। অর্থাৎ অপেক্ষা এখন বিউগলের শব্দের।
Geopulse TV
