তাইওয়ানের জন্য অনুমোদিত ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অস্ত্র প্যাকেজ ঘিরে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মার্কিন কংগ্রেস চলতি বছরের জানুয়ারিতে এই বিপুল অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিলেও, গত সপ্তাহে মার্কিন সিনেটের এক শুনানিতে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ইরান সংঘাত চলাকালীন গোলাবারুদের মজুত রক্ষা করতে বিদেশে সামরিক অস্ত্র বিক্রি আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।
এই পরিস্থিতি নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-তাইওয়ান সামরিক সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাস এবং চীন-তাইওয়ান উত্তেজনার জটিল বাস্তবতা।
১৯৪৯ সালে চীনা গৃহযুদ্ধের পর কমিউনিস্ট বাহিনী গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠা করলে রিপাবলিক অব চায়না সরকার তাইওয়ানে সরে যায়। দীর্ঘ সময় ওয়াশিংটন তাইপেকেই “চীনের বৈধ সরকার” হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় তাইওয়ান যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিত্রে পরিণত হয়। ১৯৫০-এর দশকে দুই পক্ষ পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপটিতে সামরিক সহায়তা ও সেনা মোতায়েন অব্যাহত রাখে।
তবে ১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে বেইজিংকে চীনের একমাত্র বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং তাইওয়ানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। এরপর মার্কিন কংগ্রেস “তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট” পাস করে, যার মাধ্যমে তাইওয়ানের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক এবং প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র সরবরাহের কাঠামো বজায় রাখা হয়।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের তাইওয়ান নীতি তিনটি মূল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে—“তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট”, যুক্তরাষ্ট্র-চীন যৌথ তিনটি কমিউনিক এবং রিগ্যান আমলের “সিক্স অ্যাসিওরেন্সেস”। এই নীতিগুলিই মূলত বর্তমান “স্ট্যাটাস কুয়ো” তৈরি করেছে।
চীন বরাবরই তাইওয়ানকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করে আসছে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের কথাও জানিয়েছে। অন্যদিকে তাইওয়ান নিজস্ব সরকার, সেনাবাহিনী ও অর্থনীতি নিয়ে স্বাধীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
বিগত কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ট্যাংক, জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং নজরদারি প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন অস্ত্র সরবরাহ করেছে। ১৯৯২ সালে জর্জ এইচ. ডব্লিউ. বুশ প্রশাসন ১৫০টি F-16 যুদ্ধবিমান বিক্রির অনুমোদন দেয়। ২০১৯ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ৬৬টি F-16V যুদ্ধবিমান বিক্রির জন্য ৮ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি অনুমোদন করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাইওয়ান বড় অস্ত্র ব্যবস্থার বদলে ছোট, দ্রুত সরানো যায় এবং সহজে ধ্বংস করা কঠিন—এমন মোবাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। এই কৌশলকে “অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার” বলা হয়।
এদিকে চীন যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রিকে নিজেদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে দেখে। বেইজিং নিয়মিতভাবে এসব চুক্তির প্রতিবাদ জানায় এবং কখনও কখনও সংশ্লিষ্ট মার্কিন প্রতিরক্ষা সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করে।
সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর জানান, তিনি এখনও তাইওয়ানের নতুন অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। পরে তিনি বলেন, তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তের সঙ্গে কথা বলার আশা করছেন, যদিও দুই নেতার মধ্যে কোনও নির্দিষ্ট ফোনালাপের পরিকল্পনা এখনও হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, তাইওয়ান প্রণালিতে উত্তেজনা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্যও বড় ঝুঁকি। কারণ তাইওয়ান বিশ্বের উন্নত সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের কেন্দ্রগুলোর একটি। ফলে সেখানে সংঘাত শুরু হলে পুরো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়তে পারে।
Geopulse TV
