ট্রাম্পের ডিগবাজি এবং এক অনিশ্চিত বিশ্বমঞ্চ
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক কূটনীতি বরাবরই এক গোলকধাঁধার মতো। কিন্তু ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে তিনি যেভাবে ক্ষণে ক্ষণে নিজের সিদ্ধান্ত পাল্টাচ্ছেন, তাতে গোটা বিশ্ব আজ চরম বিস্মিত এবং আতঙ্কিত। কখনো তিনি ইরানকে “মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়ার” হুমকি দিচ্ছেন, আবার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করে বলছেন যে তিনি হামলা বাতিল করেছেন। এই যে একের পর এক কূটনৈতিক ডিগবাজি, একে বিশ্লেষকরা ঠাট্টা করে নাম দিয়েছেন “টাকো” (TACO – Trump Always Chickens Out) স্ট্যান্স। অর্থাৎ, মুখে চরম আগ্রাসনের কথা বললেও কাজের বেলায় ট্রাম্পের পিছিয়ে যাওয়ার পুরনো অভ্যাস।
কিন্তু এই খামখেয়ালি কূটনীতির মাঝেই একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটেছে, যা ভারতের মতো শান্তিকামী দেশের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। ট্রাম্প যখন ইরানের ক্ষেত্রে বারবার পিছু হটছেন, ঠিক তখনই ভারত মহাসাগরে ভারতের সাধারণ বাণিজ্যিক কার্গো জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। এই দ্বিচারিতা এবং এর বিপরীতে বিশ্বমঞ্চে বিশ্বশান্তির রক্ষক দাবিদার ‘রাষ্ট্রসংঘ’-এর যে পঙ্গু দশা ও চরম নীরবতা, তা নিয়ে আজ বড়সড় প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে।
ট্রাম্পের অন্তহীন ডিগবাজি: হুমকির গর্জন, সিদ্ধান্তের ফাঁপা বেলুন
গত কয়েক মাস ধরে ইরানকে কেন্দ্র করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের খামখেয়ালি আচরণের একটি সংক্ষিপ্ত খতিয়ান নিচে তুলে ধরা হলো, যা প্রমাণ করে কেন তাকে নিয়ে বিশ্ব রাজনীতি আজ সন্দিহান:
২২ মার্চ – ২৮ মার্চ: ডেডলাইনের নাটক: পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ শক্ত হওয়ার পর ট্রাম্প হুমকি দেন যে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এই রুট না খুললে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ‘ধ্বংস’ করে দেওয়া হবে। কিন্তু নির্ধারিত সময় আসতেই তিনি সেই সময়সীমা প্রথমে ২৮ মার্চ এবং পরবর্তীতে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়িয়ে দেন।
৩১ মার্চ: ‘খার্গ দ্বীপ’ উড়িয়ে দেওয়ার ফাঁকা আওয়াজ: ট্রাম্প আবারও হুঙ্কার ছাড়েন, হরমুজ প্রণালী অবিলম্বে ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত না করলে ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র, তেলের খনি এবং বিখ্যাত খার্গ দ্বীপ বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু যথারীতি এর পর কোনো সামরিক পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
১ এপ্রিল – ৫ এপ্রিল: স্টোন এজ এবং ইস্টার সানডে বিতর্ক : এপ্রিলের শুরুতে ট্রাম্প বলেন তিনি ইরানকে ‘পাথর যুগে’ (Stone Age) ফেরত পাঠাবেন। ইস্টার সানডের দিন ট্রুথ সোশ্যালে চরম অবমাননাকর ভাষায় পোস্ট করে ঘোষণা করেন যে আমেরিকান বাহিনীর টার্গেটে এবার ইরানের ব্রিজ ও পাওয়ার প্ল্যান্ট রয়েছে। কিন্তু হুমকির পর হুমকি এলেও বাস্তবে কোনো আক্রমণ হয়নি।
৭ এপ্রিল: ‘সভ্যতা ধ্বংস’ করার হুমকি ও যুদ্ধবিরতি: ট্রাম্প এক নজিরবিহীন পোস্টে বলেন, “আজ রাতে একটি আস্ত প্রাচীন সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে।” এই মন্তব্যে বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠলে মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়।
৪-৫ মে: ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’-এর চরম ব্যর্থতা: হরমুজ প্রণালীতে আটকে থাকা বাণিজ্যিক জাহাজ উদ্ধারে ধুমধাম করে ‘অপারেশন প্রজেক্ট ফ্রিডম’ শুরু করে মার্কিন সামরিক বাহিনী। কিন্তু ইরানি বাহিনী পাল্টা গুলি চালাতেই মাত্র একদিনের মাথায় ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে এই অপারেশন আপাতত ‘স্থগিত’ করা হলো।
১১ জুন: ‘ভেরি হার্ড’ হামলার ঘোষণা ও মধ্যরাতে ইউ-টার্ন: দুই দিনের দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ট্রাম্প কড়া ভাষায় বলেন, “আজ রাতে ইরানকে খুব শক্ত আঘাত (VERY HARD TONIGHT) করা হবে।” কিন্তু এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি আবার ইউ-টার্ন নিয়ে জানান, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে আলোচনা সফল হয়েছে, তাই তিনি হামলা বাতিল করলেন!
ভারতের সাধারণ কার্গো জাহাজে হামলা: ট্রাম্প আসলে কী প্রমাণ করতে চান?
আমেরিকার এই প্রেসিডেন্ট একদিকে যখন মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিশালী পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র ইরানের সামরিক শক্তির সামনে বারবার নিজের ‘টাকো’ বা কাপুরুষোচিত নীতির পরিচয় দিচ্ছেন, ঠিক তখনই ভারত মহাসাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমায় ভারতের সাধারণ বাণিজ্যিক কার্গো জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক বিরাট বিস্ময় এবং ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
ট্রাম্প এই হামলার মাধ্যমে বিশ্বকে বা ভারতকে ঠিক কী প্রমাণ করতে চাইছেন?
১. শক্তির আস্ফালনে দ্বিচারিতা: ইরানের মতো দেশের সামরিক প্রতিরোধ বা পাল্টা আঘাতের ভয়ে মার্কিন প্রশাসন যখন বারবার পিছু হটছে, তখন আন্তর্জাতিক জলসীমায় ভারতের মতো একটি নিরপেক্ষ ও শান্তিকামী দেশের বাণিজ্যিক জাহাজে পরোক্ষ আক্রমণ বা নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়া আমেরিকার চরম দ্বিচারিতাকেই স্পষ্ট করে।
২. ভারত মহাসাগরে আধিপত্য বিস্তারের নোংরা খেলা: ভারতের সাধারণ কার্গো জাহাজ কোনো যুদ্ধের অংশ নয়। এগুলো বিশ্ব বাণিজ্যের লাইফলাইন। এদের ওপর হামলা বা এগুলোকে অরক্ষিত রেখে ট্রাম্প হয়তো ভারতকে পরোক্ষভাবে বার্তা দিতে চান যে, আমেরিকার শর্তহীন আনুগত্য স্বীকার না করলে আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যে ভারতের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে।
৩. ব্যর্থতা ঢাকার মরিয়া চেষ্টা: ইরানের সাথে একের পর এক কূটনৈতিক ব্যর্থতা এবং আমেরিকার বিশ্বস্ত মিত্রদের (যেমন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ যিনি বলেছিলেন, ‘আপনার প্রতিদিন কথা বলার প্রয়োজন নেই’) সমালোচনার মুখে ট্রাম্প হয়তো অন্য কোথাও জলঘোলা করে নিজের দেশের ভোটারদের সামনে নিজেকে ‘স্ট্রং লিডার’ হিসেবে জাহির করতে চাইছেন।
রাষ্ট্রসংঘ কি তবে আজ কোল্ড স্টোরেজ বা হিমঘরে পরিণত হয়েছে?
ভারতীয় জাহাজে এই ন্যাক্কারজনক হামলার ঘটনার পর আন্তর্জাতিক মহলে যে তীব্র প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত ছিল, তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। বিশেষ করে, বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান ‘রাষ্ট্রসংঘ’ (UN) এই বিষয়ে এক অদ্ভুত ও রহস্যজনক নীরবতা পালন করছে। এই ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—জাতিপুঞ্জ বা রাষ্ট্রসংঘ নামক প্রতিষ্ঠানটি কি আজ একটি ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত হয়েছে? এটি কি আদতে কোনো হিমঘর বা কোল্ড স্টোরেজ, যেখানে বৈশ্বিক সমস্যাগুলোকে চিরতরে জমিয়ে রাখা হয়?
এর সপক্ষে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট নিচে আলোচনা করা হলো:
পঙ্গু কার্যকারিতা এবং পরাশক্তির দাসত্ব: রাষ্ট্রসংঘ আজ তার সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য থেকে শত যোজন দূরে সরে গেছে। আমেরিকা বা তাদের মিত্রদের স্বার্থ যেখানে জড়িয়ে থাকে, সেখানে রাষ্ট্রসংঘের ভূমিকা হয়ে যায় খাঁচায় বন্দি পাখির মতো। ভারতের জাহাজে হামলার পর কোনো কড়া নিন্দা বা জরুরি নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক না হওয়া প্রমাণ করে যে, সাধারণ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর নিরাপত্তার কোনো মূল্য নেই এই সংস্থার কাছে।
ভেটো পাওয়ারের অপব্যবহার ও কাঠামোগত পচন: রাশিয়া, আমেরিকা বা চীনের মতো দেশগুলো নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থে রাষ্ট্রসংঘকে যেভাবে ব্যবহার করছে, তাতে এই প্রতিষ্ঠানের কোনো স্বাধীন অস্তিত্ব আর অবশিষ্ট নেই। যেকোনো বড় সংকটে এটি কেবল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করার একটি ‘টক শো’ মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইনের অসারতা: আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন (UNCLOS) অনুযায়ী বাণিজ্যিক জাহাজের সুরক্ষা দেওয়া বিশ্বের সব দেশের দায়িত্ব। কিন্তু রাষ্ট্রসংঘের নিষ্ক্রিয়তা জলদস্যু এবং উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে আরও উৎসাহিত করছে, যা পরোক্ষভাবে ভারতের মতো উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তির বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করার বৈশ্বিক চক্রান্তের অংশ বলেই মনে হয়।
আত্মনির্ভরতার বিকল্প নেই । ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই খামখেয়ালি ‘টাকো’ নীতি এবং ক্ষণে ক্ষণে ডিগবাজি খাওয়া বিশ্বকে এক গভীর অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আজ যারা বড় বড় কথা বলে যুদ্ধ শুরু করে, পরক্ষণেই তারা নিজেদের স্বার্থে যুদ্ধবিরতি করে বা পিছু হটে। আর এর মাশুল গুনতে হচ্ছে ভারতের মতো দেশের সাধারণ নাবিক এবং বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে।
একই সাথে রাষ্ট্রসংঘের এই ‘হিমঘর’ দশা প্রমাণ করে দিয়েছে যে, সংকটের সময়ে কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা বা তথাকথিত ‘বিশ্বের মোড়ল’ দেশ ভারতের পাশে এসে দাঁড়াবে না। ভারতের সাধারণ কার্গো জাহাজে হামলার ঘটনা এবং তার পর রাষ্ট্রসংঘের এই মরণোত্তর নীরবতা দিল্লির জন্য একটি বড় শিক্ষা। ভারতকে নিজের নৌ-সীমানা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুট রক্ষায় নিজের শক্তির ওপরই ভরসা করতে হবে। বিশ্বমঞ্চে শান্তি টিকিয়ে রাখতে ট্রাম্পের খামখেয়ালি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্ট কিংবা রাষ্ট্রসংঘের পঙ্গু বিবৃতির ওপর নির্ভর করার দিন এখন শেষ।
Geopulse TV
