মোদির ‘মেগা ডিপ্লোম্যাসি’! যুদ্ধের আগুনের মাঝেই ইউরোপ-গালফ সফরে ভারতের গোপন মাস্টারপ্ল্যান

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগুন… হরমুজ প্রণালী ঘিরে তীব্র উত্তেজনা… বিশ্বজুড়ে তেলের দাম অস্থির… আর ঠিক এই সময়েই পাঁচ দেশের ঝড়ো সফরে বেরিয়ে পড়লেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী Narendra Modi
প্রশ্ন উঠছে— এটা কি শুধুই কূটনৈতিক সফর? নাকি এর পিছনে লুকিয়ে রয়েছে ভারতের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ইউরোপে নতুন শক্তি হিসেবে উঠে আসার বিশাল পরিকল্পনা?

সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে শুরু করে নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, নরওয়ে এবং ইতালি— প্রতিটি দেশেই এবার ভারতের লক্ষ্য একেবারে স্পষ্ট। চীনকে টেক্কা দিয়ে সাপ্লাই চেইনের নতুন কেন্দ্র হওয়া, ইউরোপের সঙ্গে প্রযুক্তিগত জোট গড়া, আর জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করা।

ইউএই: ভারতের জ্বালানি লাইফলাইন আরও শক্তিশালী?

সফরের প্রথম গন্তব্য সংযুক্ত আরব আমিরাত। সেখানে ইউএই প্রেসিডেন্ট Mohamed bin Zayed Al Nahyan-এর সঙ্গে বৈঠক করবেন মোদি।

বিশ্বজুড়ে যখন তেলের বাজারে অস্থিরতা, তখন ভারতের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল জ্বালানি নিরাপত্তা। আর সেই জায়গাতেই ইউএই ভারতের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হয়ে উঠেছে।

সূত্রের দাবি, এই সফরে এলপিজি এবং স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ নিয়ে দুটি বড় সমঝোতা স্মারক বা MoU সই হতে পারে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে যুদ্ধ বা আন্তর্জাতিক সংকট হলেও ভারতের জ্বালানি মজুত আরও সুরক্ষিত হবে।

শুধু তাই নয়, ভারত-ইউএই বাণিজ্য ইতিমধ্যেই ১০০ বিলিয়ন ডলার পার করেছে। দুই দেশ এখন ২০৩২ সালের মধ্যে এই বাণিজ্যকে ২০০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যেতে চাইছে।

সবচেয়ে বড় বিষয়— ভারত ও ইউএই এখন ডলার বাদ দিয়ে নিজেদের মুদ্রায় লেনদেন বাড়াচ্ছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে ডলারের উপর নির্ভরতা কমানোর বড় পদক্ষেপ নিচ্ছে দুই দেশ।

নেদারল্যান্ডস: সেমিকন্ডাক্টর যুদ্ধের নতুন অধ্যায়

মোদির দ্বিতীয় গন্তব্য নেদারল্যান্ডস।
এই সফরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ— ভারতের সেমিকন্ডাক্টর স্বপ্ন। বিশ্বজুড়ে এখন চিপ যুদ্ধ চলছে। আমেরিকা-চীন সংঘাতের মাঝেই ভারতকে নতুন বিকল্প হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে ইউরোপ। আর সেই কারণেই ভারতের টাটা ইলেকট্রনিক্স এবং ডাচ প্রযুক্তি জায়ান্ট ASML-এর মধ্যে বড় চুক্তি হতে চলেছে।

গুজরাটের ঢোলেরায় তৈরি হতে চলা সেমিকন্ডাক্টর প্ল্যান্টে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দেবে ASML।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তি ভারতের প্রযুক্তি শিল্পে গেমচেঞ্জার হতে পারে।

এছাড়া জল ব্যবস্থাপনা, হাইড্রোজেন শক্তি এবং সামুদ্রিক প্রযুক্তিতেও দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ছে।
ভারত এখন শুধু শ্রমশক্তির দেশ নয়— প্রযুক্তি এবং উৎপাদনের বড় কেন্দ্র হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।

সুইডেন: চীনের বিকল্প হিসেবে ভারতের উত্থান

সুইডেন সফরও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ ইউরোপের বহু দেশ এখন চীনের উপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে। আর সেই জায়গায় ভারতকে সবচেয়ে বড় বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। সুইডেন ইতিমধ্যেই তাদের টেলিকম নেটওয়ার্ক থেকে চীনা কোম্পানিগুলিকে সরিয়ে দিয়েছে। ফলে ভারত-সুইডেন প্রযুক্তিগত সম্পর্ক দ্রুত বাড়ছে।

সবচেয়ে বড় খবর— সুইডেন ও ভারতের মধ্যে তৈরি হচ্ছে “Sweden-India Technology and AI Corridor” বা SITAC।
এখানে কাজ হবে 6G, AI, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং লাইফ সায়েন্স নিয়ে। অন্যদিকে সুইডিশ প্রতিরক্ষা সংস্থা Saab ভারতের ঝাঝরে তৈরি করছে কার্ল-গুস্তাফ অস্ত্রের উৎপাদন কেন্দ্র। এটি সুইডেনের বাইরে তাদের প্রথম এমন কারখানা। এর ফলে ভারত শুধু অস্ত্র কিনবে না, বরং নিজেই প্রতিরক্ষা উৎপাদনের বড় কেন্দ্র হয়ে উঠতে চাইছে।

নরওয়ে: আর্কটিক থেকে জাহাজ শিল্প— ভারতের বড় লক্ষ্য

৪৩ বছর পর কোনও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম দ্বিপাক্ষিক সফর হতে চলেছে নরওয়েতে। নরওয়ে বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ। তাদের সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের আকার প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার। সেই বিপুল অর্থের বড় অংশ এখন ভারতীয় বাজারে বিনিয়োগ হচ্ছে। ভারতের জাহাজ শিল্পেও নরওয়ের বড় ভূমিকা তৈরি হচ্ছে। কোচিন শিপইয়ার্ড নরওয়ের জন্য পরিবেশবান্ধব জাহাজ তৈরি করছে।

এছাড়া আর্কটিক অঞ্চলে ভারতের উপস্থিতিও বাড়ছে। স্বালবার্ডে ইসরোর অ্যান্টেনা চালু হয়েছে, আর হিমাদ্রি গবেষণা কেন্দ্রেও কাজ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের ভূ-রাজনীতিতে আর্কটিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। আর ভারত সেই লড়াইয়ে আগেভাগেই জায়গা করে নিতে চাইছে।

ইতালি: ইউরোপ-ভারত করিডরের বড় বাজি

সফরের শেষ গন্তব্য ইতালি।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী Giorgia Meloni-র সঙ্গে বৈঠকে মূল ফোকাস থাকবে IMEEC করিডর।

এই করিডর ভারত, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপকে সরাসরি যুক্ত করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি চীনের Belt and Road Initiative-এর বড় বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।

সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক খবর— Tata Motors ইতালির Iveco Group অধিগ্রহণ করেছে প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ইউরোতে। এটি ইতালিতে ভারতের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। এর পাশাপাশি ইতালি ভারতীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছে।

ভারতের আসল লক্ষ্য কী?

এই পুরো সফরের মূল বার্তা একটাই—
ভারত এখন শুধু দক্ষিণ এশিয়ার শক্তি নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও প্রযুক্তির অন্যতম কেন্দ্র হতে চাইছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, তেলের সংকট, চীনের সঙ্গে পশ্চিমের দূরত্ব— এই সমস্ত পরিস্থিতিকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে নয়াদিল্লি।

একদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা, অন্যদিকে প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, সাপ্লাই চেইন এবং ইউরোপীয় বিনিয়োগ— সবকিছুকে একসঙ্গে টেনে এনে ভারত এখন ভবিষ্যতের বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজের জায়গা আরও শক্ত করতে চাইছে।

About Geopulse TV

Check Also

চাঁদে এবার ২০০ দিন! কৃত্রিম হিটারযুক্ত নতুন ল্যান্ডার তৈরিতে ISRO-পরমাণু শক্তি দপ্তরের যুগান্তকারী উদ্যোগ

ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা Indian Space Research Organisation (ISRO) এবং Department of Atomic Energy (DAE) …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *