অস্ট্রেলিয়ার বহুল আলোচিত ‘মাশরুম হত্যাকাণ্ড’ মামলায় দোষী সাব্যস্ত এরিন প্যাটারসনের আইনজীবীরা তার সাজা ও দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, মামলার রায় ঘোষণার আগে জুরি সদস্যদের একই হোটেলে রাখা হয়েছিল যেখানে প্রসিকিউশন দলের সদস্য, গুরুত্বপূর্ণ এক পুলিশ সাক্ষী ও সাংবাদিকরাও অবস্থান করছিলেন। এই ঘটনাকে তারা ‘বিপর্যয়কর’ ভুল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
২০২৩ সালে ভিক্টোরিয়ার নিজ বাড়িতে আত্মীয়দের জন্য খাবার হিসেবে বিফ ওয়েলিংটন পরিবেশন করেছিলেন এরিন প্যাটারসন। ওই খাবারে প্রাণঘাতী ডেথ ক্যাপ মাশরুম ছিল বলে অভিযোগ। এতে তার শ্বশুর ডন প্যাটারসন ও শাশুড়ি গেইল প্যাটারসন—দুজনেরই মৃত্যু হয়। গেইলের বোন হিদার উইলকিনসনও মারা যান। অন্যদিকে হিদারের স্বামী ইয়ান উইলকিনসন গুরুতর অসুস্থ হলেও বেঁচে যান।
৫১ বছর বয়সী প্যাটারসন বর্তমানে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন। বুধবার মেলবোর্নের ভিক্টোরিয়া কোর্ট অব আপিলে শুনানির সময় তিনি আদালতে সরাসরি উপস্থিত না থেকে কারাগার থেকে ভিডিও সংযোগে অংশ নেন।
প্যাটারসনের আইনজীবী রিচার্ড এডনি আদালতকে বলেন, বিচার চলাকালে জুরি সদস্যরা যে হোটেলে ছিলেন, সেখানে প্রসিকিউশন দলের সদস্য, একজন গুরুত্বপূর্ণ পুলিশ সাক্ষী এবং সাংবাদিকরাও ছিলেন। তার দাবি, এই পরিস্থিতি রায়ের নিরপেক্ষতা ও বিচারপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং দোষী সাব্যস্ত করার রায় বাতিল করা উচিত।
তিনি বলেন, ন্যায়বিচার শুধু হওয়াই নয়, তা হয়েছে বলে যেন মানুষের কাছে প্রতীয়মানও হয়—এ জন্য নতুন করে বিচার প্রয়োজন।
তবে ভিক্টোরিয়ার ডিরেক্টর অব পাবলিক প্রসিকিউশন্স ব্রেন্ডন কিসান স্বীকার করেছেন, ঘটনাটি দুঃখজনক। কিন্তু তার দাবি, বিষয়টি দুর্ঘটনাবশত ঘটেছে এবং জুরি সদস্যদের সঙ্গে অন্য কারও যোগাযোগ হয়েছিল—এমন কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, যদি আদালত মেনে নেয় যে জুরি ও অন্য ব্যক্তিদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ হয়নি, তাহলে এই ঘটনাকে বিচারপ্রক্রিয়ার মৌলিক অনিয়ম বলা যায় না।
প্যাটারসনের আইনজীবীরা আরও দাবি করেছেন, ডেথ ক্যাপ মাশরুম তিনি কীভাবে সংগ্রহ করেছিলেন—এ বিষয়ে প্রসিকিউশনের তত্ত্ব ছিল অতিরিক্ত অনুমাননির্ভর।
বিচারের সময় প্রসিকিউশন দাবি করেছিল, প্যাটারসন তার নিজ এলাকার কাছাকাছি ডেথ ক্যাপ মাশরুমের সন্ধান পাওয়ার পর সেগুলো সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন। নাগরিক বিজ্ঞানভিত্তিক ওয়েবসাইট iNaturalist-এ ওই এলাকায় মাশরুম পাওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। একই সময়ে প্যাটারসনের মোবাইল ফোন ওই দুই এলাকার সেল টাওয়ারের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছিল।
তবে আপিল শুনানিতে আইনজীবী ভেরোনিকা ড্রাগো দাবি করেন, এই মোবাইল ফোনের তথ্য কেবল সম্ভাব্য অবস্থান নির্দেশ করে। প্যাটারসন ওই ওয়েবসাইটের পোস্ট দেখেছিলেন বা সেগুলো সম্পর্কে জানতেন—এমন কোনো প্রমাণ নেই। তার মতে, প্রসিকিউশন দুর্বল তথ্যকে অতিরঞ্জিত করে একটি শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
অন্যদিকে প্রসিকিউশনের আইনজীবী জেরেমি ম্যাকউইলিয়ামস মোবাইল ফোন টাওয়ার বিশেষজ্ঞের তথ্য ব্যবহারের পক্ষে যুক্তি দেন। তার দাবি, প্যাটারসনের ডেথ ক্যাপ মাশরুম সংগ্রহের সুযোগ ছিল কি না, তা বিবেচনায় এই তথ্য জুরির জন্য প্রাসঙ্গিক ছিল।
আপিলে আরও দাবি করা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের কয়েক মাস আগে প্যাটারসন ফেসবুকে তার বিচ্ছিন্ন স্বামী সাইমন প্যাটারসন এবং শ্বশুর-শাশুড়ির বিরুদ্ধে যেসব মন্তব্য করেছিলেন, সেগুলো মামলার জন্য প্রাসঙ্গিক ছিল না।
প্যাটারসনের আইনজীবীরা প্রসিকিউশনের জেরা এবং সমাপনী বক্তব্য নিয়েও আপত্তি তুলেছেন। তাদের দাবি, বিচার চলাকালে প্রসিকিউশন পক্ষের আচরণ ছিল অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক এবং সমাপনী বক্তব্যে একাধিক অনিয়ম ছিল।
তবে প্রসিকিউশন বলছে, মামলায় দোষী সাব্যস্ত করার মতো প্রমাণ ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। খাবারের আমন্ত্রণ, প্যাটারসনের জন্য আলাদা প্লেটে খাবার পরিবেশন, তার নিজের শারীরিক অবস্থার সঙ্গে অন্য অতিথিদের ভিন্ন চিকিৎসাগত ফলাফল এবং অন্যান্য অপরাধমূলক আচরণ—সব মিলিয়ে এটি ইচ্ছাকৃত বিষ প্রয়োগের দিকেই স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে।
এদিকে প্যাটারসনের সাজা নিয়েও আপিল করেছে ভিক্টোরিয়ার ডিরেক্টর অব পাবলিক প্রসিকিউশন্স। বর্তমানে ৩৩ বছর কারাভোগের পর প্যারোলের জন্য আবেদন করার সুযোগ রয়েছে তার। প্রসিকিউশনের দাবি, এই সময়সীমা ‘স্পষ্টতই অপর্যাপ্ত’ এবং বিচারকের এভাবে নির্দিষ্ট প্যারোলের সময়সীমা নির্ধারণ করাও যথাযথ হয়নি।
আপিল আদালতের তিন বিচারক শুনানি শেষে সিদ্ধান্ত সংরক্ষণ করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে প্যাটারসনের দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় বহাল থাকবে নাকি নতুন করে বিচার হবে—তা জানতে আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
Geopulse TV
