ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের লক্ষ্য কতটা সফল? ক্ষেপণাস্ত্র, পারমাণবিক কর্মসূচি ও শাসন পরিবর্তন নিয়ে বিশ্লেষণ

ওয়াশিংটন: ফেব্রুয়ারি ২৮ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল ইরানে বিমান হামলা শুরু করার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিক লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন—ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস থেকে শুরু করে দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা পর্যন্ত।

তিন মাসেরও বেশি সময় পর, একটি প্রাথমিক শান্তি চুক্তি সামনে আসার প্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠছে—ট্রাম্পের সেই লক্ষ্য কতটা পূরণ হয়েছে?

ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন:
যুদ্ধের আগে ইরানের কাছে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম ব্যালিস্টিক মিসাইল ভাণ্ডার ছিল, যার সংখ্যা ২,৫০০ থেকে ৬,০০০-এর মধ্যে। এর মধ্যে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ২,০০০ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম ছিল এবং কিছুতে ক্লাস্টার ওয়ারহেডও ছিল। পাশাপাশি ইরান দীর্ঘ-পাল্লার ‘শাহেদ’ ড্রোন উৎপাদনেও এগিয়ে ছিল।

যুদ্ধের এক মাসের মাথায় মার্কিন সূত্র জানায়, এই ভাণ্ডারের এক-তৃতীয়াংশ ধ্বংস হয়েছে এবং আরও এক-তৃতীয়াংশ ক্ষতিগ্রস্ত বা অকার্যকর হয়েছে। মার্কিন অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার জানান, ১,৫০০-র বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৬,০০০ ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে।

তবে ইরানের হাতে এখনও কিছু ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যার প্রমাণ হিসেবে ৬ জুন কুয়েত ও বাহরাইন এবং ৭ জুন ইজরায়েলে হামলার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও এতে বড় ক্ষতি হয়নি।

প্রচলিত সামরিক শক্তি:
মার্কিন সেনা দাবি করেছে, ইরানের প্রচলিত সামরিক শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে। ১৬১টি নৌযান ধ্বংস এবং ৮২% বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অচল করা হয়েছে বলে দাবি। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন ১০০টি মিশন চালানো ইরানি বিমান বাহিনী এখন কার্যত নিষ্ক্রিয়।

তবে এর পরেও ইরান হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ রাখতে সক্ষম হয়েছিল, যা বিশ্ব জ্বালানির এক-পঞ্চমাংশ পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

পারমাণবিক কর্মসূচি:
ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা। তবে যুদ্ধ ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতায় বড় পরিবর্তন আনতে পারেনি। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা জানায়, ইরান এক বছরের কম সময়েই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম—যা আগের হিসাবেরই সমান।

চুক্তি স্বাক্ষরের পর এই বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে। ট্রাম্প চান ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশ থেকে সরানো হোক, তবে আয়াতোল্লা মোজতবা খামেনি তা বিদেশে পাঠাতে রাজি নন।

প্রক্সি গোষ্ঠী:
ট্রাম্প ইরানের সমর্থিত ইরাক, লেবানন, গাজা ও ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। তবে ইরান এতে অনাগ্রহী। যদিও এই নেটওয়ার্ক আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে।

ইজরায়েল হামাস ও হিজবুল্লাহর বহু শীর্ষ নেতাকে হত্যা করেছে এবং সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতনের ফলে হিজবুল্লাহর সরবরাহ পথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাও প্রভাব ফেলেছে।

যুদ্ধে এই গোষ্ঠীগুলোর বড় ভূমিকা দেখা যায়নি। হামাস গাজা থেকে আক্রমণ চালায়নি, হুতিরাও লোহিত সাগরে বড় বিঘ্ন ঘটাতে পারেনি। তবে হিজবুল্লাহ ২ মার্চ যুদ্ধে যোগ দেয় এবং সংঘর্ষে লেবাননে প্রায় ৩,৭০০ জন নিহত ও ১২ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

শাসন পরিবর্তন:
যুদ্ধের আগে ট্রাম্প ইরানের জনগণকে সরকার উৎখাতের আহ্বান জানান এবং আয়াতোল্লা আলি খামেনির মৃত্যুকে বড় সুযোগ বলেন। ৬ মার্চ তিনি “নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ”-এর কথা বলেন।

যদিও ইরানের সরকার পরিবর্তন হয়নি, ট্রাম্প দাবি করেন তার লক্ষ্য পূরণ হয়েছে, কারণ নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনি দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি নতুন নেতৃত্বকে “আরও যুক্তিসঙ্গত” বলে বর্ণনা করেন। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প আর সরকার পরিবর্তনের আহ্বান পুনরাবৃত্তি করেননি।

About Desk 1

Check Also

জাতীয় নিরাপত্তার নির্দেশে Anthropic-এর শক্তিশালী AI মডেল বন্ধ, Fable 5 ও Mythos 5-এ নিষেধাজ্ঞা

মার্কিন সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত নির্দেশ মেনে শক্তিশালী দুটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) মডেল Fable 5 …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *