সারা রাত গুলির শব্দে কাঁপল মোগাদিশু, রাজনৈতিক সংঘর্ষে নতুন সংকটে সোমালিয়া

সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিশুতে বুধবার রাতভর ভারী গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা যায় এবং রাস্তায় সশস্ত্র বাহিনীর ব্যাপক মোতায়েন করা হয়। বৃহস্পতিবার নির্ধারিত সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে ঘিরে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

এএফপির সাংবাদিকদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার রাতে শুরু হওয়া গোলাগুলি বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত বিচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে। মোগাদিশুর বাসিন্দারা জানিয়েছেন, গুলির শব্দের কারণে তারা পুরো রাত ঘুমাতে পারেননি।

মোগাদিশুর হাওল ওয়াদাগ জেলার বাসিন্দা খালিমো সালাদ বলেন, “বিচ্ছিন্নভাবে চলা গুলির শব্দের কারণে আমরা সারা রাত ঘুমাতে পারিনি।” তিনি আরও জানান, বৃহস্পতিবার সকালে আরও তীব্র বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়।

তিনি বলেন, “আমরা দেখেছি ফেডারেল সরকারের বাহিনী অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করেছে।”

সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহামুদ গত মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে নিজের মেয়াদ এক বছর বাড়ানোর ঘোষণা দিলে দেশটি নতুন রাজনৈতিক সংকটে পড়ে। তার বর্তমান মেয়াদ ১৫ মে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে তিনি দাবি করেন, মার্চ মাসে সংসদে গৃহীত নতুন সংবিধানের মাধ্যমে তাকে অতিরিক্ত এক বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

প্রেসিডেন্টের এই পদক্ষেপ বিরোধী দল এবং আঞ্চলিক নেতারা প্রত্যাখ্যান করেছেন। এর প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার মোগাদিশুতে বিক্ষোভ কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

বুধবার বিক্ষোভে অংশ নিতে বিরোধী নেতারা রাজধানীতে প্রবেশ করার পরই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শী ও সাংবাদিকদের তথ্য অনুযায়ী, এরপর সংঘর্ষ শুরু হয় এবং রাতভর বিভিন্ন স্থানে তা অব্যাহত থাকে।

পুলিশ জানিয়েছে, তারা “ভারী অস্ত্রে সজ্জিত মিলিশিয়াদের” বিরুদ্ধে “বৃহৎ নিরাপত্তা অভিযান” পরিচালনা করছে। পুলিশের দাবি, এসব মিলিশিয়া রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় মর্টার হামলা চালিয়েছে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসান আলি খায়ের অভিযোগ করেছেন, বুধবার তিনি বিমানবন্দরসংলগ্ন কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত গ্রিন জোনে অবস্থিত ঘাঁটি থেকে নিজ বাসভবনে যাওয়ার পর সরকারি বাহিনীর হামলার শিকার হন। তিনি বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়েছিলেন।

বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে খায়ের দাবি করেন, প্রেসিডেন্টের অনুগত বাহিনী তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে “নিরবচ্ছিন্ন ও নির্বিচার সামরিক হামলা” চালিয়েছে।

বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত হতাহতের কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে আলোচনা শুরু হলে সংঘর্ষ অনেকটা থেমে যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নিরাপত্তা বিশ্লেষক এএফপিকে জানান, বুধবার রাতের সহিংসতা বৃহস্পতিবার সকালে আরও ছড়িয়ে পড়ে এবং পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

তিনি বলেন, “মর্টার ও ভারী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। কয়েকটি এলাকায় বেসামরিক হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে।”

আন্তর্জাতিক মহলও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মোগাদিশুতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস সহিংস ঘটনাগুলোকে “বেপরোয়া” বলে উল্লেখ করে সব পক্ষকে সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।

এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), জাতিসংঘের মিশন এবং ব্রিটিশ দূতাবাসের যৌথ বিবৃতিতে সংঘর্ষকে “গভীরভাবে উদ্বেগজনক” বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

সোমালিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে গোত্রভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামো চালু রয়েছে। প্রেসিডেন্ট মোহামুদ দেশটিকে গণতান্ত্রিক নির্বাচনী ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যেতে চান এবং গোত্রপ্রধানদের ভিত্তিতে গঠিত ব্যবস্থার পরিবর্তে সরাসরি নির্বাচন চালুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তবে প্রতিদ্বন্দ্বী গোত্রগুলোর বিভক্তি এবং দেশের বড় অংশে জঙ্গিগোষ্ঠী Al-Shabaab-এর নিয়ন্ত্রণ থাকায় নির্বাচন আয়োজনের অগ্রগতি সীমিত রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে বিরোধী দল ও আঞ্চলিক নেতারা প্রেসিডেন্টের পরিকল্পনাকে ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। ফলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও নিরাপত্তা সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

About Desk 1

Check Also

কঙ্গোর সংবিধান সংশোধন ঠেকাতে বিরোধীদের চাপ, তৃতীয় মেয়াদ নিয়ে তীব্র বিতর্ক

ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে (DRC) সংবিধান সংশোধনের সম্ভাবনা ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে। প্রেসিডেন্ট ফেলিক্স শিসেকেদির …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *