জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের ক্রমাগত বৃদ্ধি বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। মূল্যস্ফীতির চাপ কমার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ না থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির পরিস্থিতি নিয়ে রাজধানী ঢাকায় নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে সিপিডি তাদের মূল্যায়ন তুলে ধরে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে অর্থনীতি এখনও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে দেশের মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে পৌঁছেছে। জ্বালানি, পরিবহন এবং বিভিন্ন সেবার খরচ বৃদ্ধিই এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সিপিডি জানায়, মজুরি বৃদ্ধির হার এখনও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না। ফলে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং তাদের দৈনন্দিন জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মে মাসের মধ্যে জ্বালানি তেলের দামে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে। এই সময়ে ডিজেলের দাম ১৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে পেট্রোল, অকটেন এবং কেরোসিনের দাম প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দ্রুত পরিবহন খাতে ছড়িয়ে পড়ে। বাসভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়েছে। এর ফলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের খুচরা মূল্য আরও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
রান্নার জ্বালানি হিসেবেও বড় চাপ তৈরি হয়েছে। সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, ১২ কেজি ওজনের একটি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম মার্চ মাসে ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা। জুন মাসে সেই দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৮৫ টাকায়। মাত্র তিন মাসে এলপিজির দাম ৪০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
সিপিডি মনে করে, সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকট বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও মূল্য পরিস্থিতি সহজেই অস্থির হয়ে পড়তে পারে।
জ্বালানির পাশাপাশি নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। তাদের মতে, বাজারে অতিরিক্ত মধ্যস্বত্বভোগী এবং কিছু খাতে সীমিত সংখ্যক ব্যবসায়ীর আধিপত্য খুচরা পর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে এবং ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
সিপিডির মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ভোক্তাদের স্বস্তি দিতে হলে জ্বালানি খাতের পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
Geopulse TV
