দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতের প্রতিরক্ষা কূটনীতিতে বড় অগ্রগতির ইঙ্গিত দিলেন দেশটির প্রতিরক্ষা সচিব রাজেশ কুমার সিং। তিনি প্রথমবারের মতো নিশ্চিত করেছেন যে ভিয়েতনামের সঙ্গে ভারতের ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ চুক্তি ইতোমধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি জানান, ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গেও অনুরূপ একটি চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত শাংরি-লা ডায়ালগে অংশ নেওয়ার সময় সম্ভাব্য ব্রহ্মোস ক্রেতাদের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে রাজেশ কুমার সিং এই তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া—উভয় দেশের সঙ্গেই আলোচনা শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তার ভাষায়, ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে চুক্তিটি ইতোমধ্যেই স্বাক্ষরিত হয়েছে, যদিও তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জনসমক্ষে ঘোষণা করা হয়নি।
ভারতের তৈরি সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্রহ্মোস বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম দ্রুতগতির ও বহুমুখী ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। ২০২২ সালে প্রায় ৩৭৫ মিলিয়ন ডলারের চুক্তির মাধ্যমে ফিলিপাইনস প্রথম বিদেশি ক্রেতা হিসেবে ব্রহ্মোস কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর চলতি বছরের মার্চ মাসে ইন্দোনেশিয়াও ভারতের সঙ্গে ব্রহ্মোস সংগ্রহের বিষয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর কথা জানায়।
তবে ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির আর্থিক মূল্য কিংবা সরবরাহের পরিমাণ সম্পর্কে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
রাজেশ কুমার সিং বলেন, উন্নত অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি সাধারণত সেই দেশগুলোর সঙ্গেই ভাগাভাগি করা হয়, যাদেরকে নির্ভরযোগ্য ও ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “আপনি প্রযুক্তি সেই দেশগুলোর সঙ্গেই ভাগ করবেন, যাদের ওপর আপনার আস্থা রয়েছে।”
তিনি আরও জানান, আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত এসব দেশকে ‘বন্ধুসুলভ বিদেশি রাষ্ট্র’ হিসেবে বিবেচনা করে এবং তাদের সঙ্গে উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ভাগাভাগি করতে প্রস্তুত।
শাংরি-লা ডায়ালগে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে কৌশলগত স্থিতিশীলতা ও সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে বিঘ্ন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে।
তার মতে, সামরিক প্রস্তুতি কোনো দুর্বল বা অতিরিক্ত নির্ভরশীল সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে পারে না। তাই দেশগুলোর জন্য নির্ভরযোগ্য, বৈচিত্র্যময় এবং প্রযুক্তিগতভাবে অভিযোজনক্ষম প্রতিরক্ষা শিল্প কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।
ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পের অগ্রগতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, গত এক দশকে দেশটি প্রতিরক্ষা উৎপাদন, উদ্ভাবন এবং রপ্তানির ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংস্কার করেছে। বর্তমানে ভারতের সরকারি প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলো মোট উৎপাদনের প্রায় ৭২ শতাংশ পরিচালনা করছে, আর বাকি অংশ বেসরকারি খাতের অবদান।
রাজেশ কুমার সিং জানান, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, যুদ্ধবিমান এবং প্রধান যুদ্ধট্যাংক উৎপাদনে ভারত উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা অর্জন করেছে। পাশাপাশি স্থল, আকাশ ও সমুদ্রভিত্তিক প্রপালশন প্রযুক্তির ঘাটতি দূর করতেও কাজ চলছে।
তার ভাষায়, ভারতের লক্ষ্য কোনো একচেটিয়া জোট গঠন নয়; বরং এমন অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নির্ভরযোগ্য অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার করবে এবং কৌশলগত ঝুঁকি কমাবে।
Geopulse TV
