ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় মিয়ানমারের ধানচাষে বিপর্যয়, ‘চাষিরাই হারিয়ে যেতে পারে’

মুষলধারে বর্ষণের মধ্যেও মিয়ানমারের ধানচাষিদের মুখে নেই আশার আলো। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের জেরে জ্বালানি ও রাসায়নিক সারের তীব্র সংকট তৈরি হওয়ায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটির কৃষকেরা আশঙ্কা করছেন, চলতি মৌসুমে ভালো ফলনের বদলে আরও গভীর সংকটের মুখে পড়তে হবে।

মিয়ানমারের বদ্বীপ অঞ্চল কাওহমুর কাছে ১২ হেক্টর ভাড়া জমিতে ধানচাষ করা ৪৯ বছর বয়সী কৃষক সোয়ে নাইং বলেন, “দাম যদি এভাবেই বাড়তে থাকে, তাহলে আমি ভিখারি হয়ে যাব।” তিনি আরও বলেন, “চাষাবাদ ছেড়ে দিতে পারি, কিন্তু ধান ফলানোই আমার জীবনের কাজ।”

মিয়ানমারে বর্ষাকাল শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোপণ মৌসুমও শুরু হয়েছে। কিন্তু ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে ধাক্কা লেগেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংঘাত পরিস্থিতি এশিয়ার জন্য মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ওই জলপথ দিয়ে যাওয়া তেলের প্রায় ৮০ শতাংশই এশিয়ার বিভিন্ন দেশে যায়।

গৃহযুদ্ধ ও মানবিক সংকটে জর্জরিত মিয়ানমার এই পরিস্থিতিতে আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশটি তার জ্বালানি তেলের ৯০ শতাংশ আমদানি করে। জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (WFP) জানিয়েছে, রাসায়নিক সারের ৯৫ শতাংশও আমদানিনির্ভর, যার বড় অংশ আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে।

জ্বালানি ও সারের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকেরা জমি চাষের জন্য প্রয়োজনীয় রোটাভেটর চালাতে পারছেন না, আবার চারা গাছের জন্য পর্যাপ্ত সারও কিনতে পারছেন না। WFP সতর্ক করেছে, সার ব্যবহারে ৫০ শতাংশ কমে গেলে মিয়ানমারের কৃষি উৎপাদন ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

কাওহমু এলাকার আরেক কৃষক মোয়ে অং বলেন, এবার তিনি প্রতি একরে মাত্র আধা বস্তা সার ব্যবহার করবেন, যা প্রয়োজনের ছয় ভাগের এক ভাগ। তার ভাষায়, “আমি শুধু জমি আছে বলেই চাষ করছি, কিন্তু আর করতে চাই না।”

তিনি জানান, ৫০ কেজির এক বস্তা সারের দাম এখন প্রায় দুই লাখ কিয়াত বা ৪৮ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি। ফলে ঋণ নিয়ে সার কেনার পর ফসল বিক্রি করে সেই খরচ তোলা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

মিয়ানমার একসময় বিশ্বের সবচেয়ে বড় চাল রপ্তানিকারক দেশগুলোর একটি ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, সংঘাত এবং ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধ দেশটির কৃষি খাতকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

২০২১ সালে সামরিক বাহিনী গণতান্ত্রিক নেতা দাউ অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে। এরপর শুরু হওয়া সংঘাতে এখন পর্যন্ত ৯০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে পর্যবেক্ষক সংস্থা ACLED। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ৩৭ লাখের বেশি মানুষ।

এর মধ্যেই আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করেছেন, চলতি বছর শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় খরা ও তাপপ্রবাহ ডেকে আনতে পারে।

মিয়ানমার ফার্মার ইউনিয়নের চেয়ারপারসন সু সু নওয়ের আশঙ্কা, “এভাবে চলতে থাকলে একসময় এই দেশ থেকেই কৃষকেরা হারিয়ে যেতে পারে।” তিনি বলেন, “আমরা চাই না ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইতিহাসের বইয়ে পড়ুক—সত্যিই কি কোনওদিন এখানে কৃষক ছিল?”

About Desk 1

Check Also

হরমুজ প্রণালী ঘিরে ফের যুদ্ধের আশঙ্কা: মার্কিন হামলায় ক্ষুব্ধ ইরান, তেলের বাজারে নতুন অস্থিরতা

হরমুজ প্রণালীর কাছে নতুন করে মার্কিন হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্য। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *