ব্রিটেনে ‘গ্রুমিং গ্যাং’-এর নারকীয়তা: ব্রিটিশ সংসদে নির্যাতিতাদের লোমহর্ষক সাক্ষ্য পেশ এমপি রূপার্ট লোর

যুক্তরাজ্যের (UK) রাজনীতি এবং সমাজব্যবস্থা বর্তমানে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ভয়াবহ ইস্যুতে তোলপাড়। ব্রিটিশ সাংসদ রূপার্ট লো (Rupert Lowe) সে দেশের সংসদে দাঁড়িয়ে ‘গ্রুমিং গ্যাং’ (Grooming Gangs) বা সংগঠিত শিশু যৌন নির্যাতন চক্রের যে ভয়ঙ্কর চিত্র তুলে ধরেছেন, তা পুরো বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। সরকারি তদন্ত ও লোর নিজস্ব অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, এই চক্রের অধিকাংশ অপরাধীই পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ট্যাক্সি চালক এবং বাজার ব্যবসায়ী। সংসদে দাঁড়িয়ে রূপার্ট লো নির্যাতিতাদের এমন কিছু লিখিত বয়ান পড়েছেন, যা সভ্য সমাজের পক্ষে কল্পনা করাও কঠিন।

নির্যাতিতাদের লোমহর্ষক সাক্ষ্য

সাংসদ লো তাঁর স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের যেসব বক্তব্য সংগ্রহ করেছেন, তার কয়েকটি সংসদে পাঠ করেন:

চরম শারীরিক নির্যাতন : এক নির্যাতিতা জানান, যখন তাঁর বয়স মাত্র ১২ বছর, তখন এক অপরাধী তাঁর শরীরের ভেতরে জোরপূর্বক একটি কাঁচের বোতল ঢুকিয়ে দেয় এবং ভেতরেই সেটি ভেঙে ফেলা হয়।
গণধর্ষণ ও পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা : অন্য এক মহিলার দাবি, মাত্র ১৩ বছর বয়স থেকে শুরু করে তিন বছরে প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ জন পুরুষ তাঁকে ধর্ষণ করেছে। এমনকি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একাধিক পুলিশ কর্মীও তাঁকে ধর্ষণ করে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
চিকিৎসকদের উদাসীনতা: এক ১৫ বছরের কিশোরী মারাত্মক রক্তাক্ত ও অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকদের জানায় যে তার পানীয়তে কিছু মেশানো হয়েছিল। কিন্তু হাসপাতালের কর্মীরা কোনো প্রকার জিজ্ঞাসাবাদ না করেই স্রেফ কিছু ওষুধ দিয়ে তাকে ছেড়ে দেয়।
পশুসুলভ আচরণ: নির্যাতনের মাত্রা এতটাই নির্মম ছিল যে, মেয়েদের কুকুরের খাঁচায় বন্দি করে রাখা হতো। এক ভুক্তভোগীর বয়ান অনুযায়ী, পুরুষরা তাকে কুকুর দিয়ে ধর্ষণ করিয়েছিল এবং চারপাশে দাঁড়িয়ে হাসাহাসি ও বাজি ধরে সেই দৃশ্য ভিডিও করছিল।
প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা: চাইল্ড কেয়ার হোম বা সরকারি শিশু আশ্রয়কেন্দ্রের কর্মীরাও এর সঙ্গে জড়িত ছিল। অপরাধীরা গাড়ির হর্ন বাজালেই কর্মীরা শিশুদের তাদের হাতে তুলে দিত। ঈদ ও বিভিন্ন উৎসবের ছুটিতে এই নারকীয় পার্টি ও নির্যাতনের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পেত।

বর্ণবাদী মানসিকতা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি

নির্যাতিতাদের বয়ান অনুযায়ী, এই অপরাধের পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট বর্ণবাদী ও ধর্মীয় মানসিকতা কাজ করত। অপরাধীরা মনে করত শ্বেতাঙ্গ বা খ্রিস্টান মেয়েদের কোনো নৈতিক মূল্য নেই, যেখানে মুসলিম মেয়েরা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। এই কারণে প্রায় সমস্ত শিকারই ছিল শ্বেতাঙ্গ নাবালিকা। এমনকি এক ভুক্তভোগী এক মুসলিম ধর্মগুরুর (ইমাম) ছেলের মাধ্যমে গর্ভবতী হয়ে পড়লে, সেই ইমাম ঘটনা ধামাচাপা দিতে ছেলেকে তড়িঘড়ি অন্য জায়গায় বিয়ে দিয়ে দেন।

তদন্তের রিপোর্ট ও অতীত ইতিহাস

গত বছর রূপার্ট লোর নেতৃত্বে পরিচালিত একটি বেসরকারি তদন্তে জানা গেছে, ব্রিটেনের অন্তত ৮৫টি এলাকায় এই ‘রেপ গ্যাং’ কয়েক দশক ধরে সক্রিয় রয়েছে এবং স্থানীয় প্রশাসন ও পাবলিক বডিগুলো চরম অবহেলা দেখিয়েছে।

রদারহ্যাম কেলেঙ্কারি (Rotherham Scandal): ২০০১ সালের দিকে ইয়র্কশায়ারের রদারহ্যাম শহরে এই পদ্ধতিগত শিশু নির্যাতনের বিষয়টি প্রথম সামনে আসে। কিন্তু অপরাধীদের সাজা হতে প্রায় এক দশক সময় লেগে যায়। ২০১০ সালে পাঁচজন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত পুরুষকে সাজা দেওয়া হয়। ২০১৪ সালে অধ্যাপক অ্যালেক্সিস জেসির (Alexis Jay) রিপোর্টে জানা যায়, রদারহ্যামে ১৯৯৭ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে ১,৪০০-র বেশি শিশু নির্যাতিত হয়েছিল। বর্ণবাদী তকমা পাওয়ার ভয়ে তৎকালীন প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

রদারহ্যাম ছাড়াও রচডেল (Rochdale), অক্সফোর্ড (Oxford), টেলফোর্ড (Telford) এবং ব্রিস্টলসহ (Bristol) প্রায় ৫০টি শহরে এই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান

২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক (Rishi Sunak) এই চক্র দমনে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেন।

* ২০২৩ সালের রিপোর্টে দেখা গেছে, ব্রিটেনে শিশুদের বিরুদ্ধে ১.১৫ লক্ষেরও বেশি যৌন অপরাধের ঘটনা ঘটেছে।
* এর মধ্যে ৩.৭% (৪,২২৮টি) ছিল দলবদ্ধ বা গ্যাং-ভিত্তিক অপরাধ।
* এই টাস্কফোর্স প্রথম বছরেই ৫৫০ জনেরও বেশি সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

২০২৪ সালে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহামের (Andy Burnham) একটি স্বাধীন রিভিউতে রচডেল কাউন্সিলের মারাত্মক ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করা হয়। ২০১২ সালের ‘অপারেশন স্প্যান’-এর মাধ্যমে ৮ জন ব্রিটিশ-পাকিস্তানি নাগরিকসহ মোট ৯ জনের সাজা হওয়ার পর থেকে এখনও পর্যন্ত শত শত অপরাধীকে গ্রেপ্তার ও শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

About Desk 1

Check Also

‘মনে হচ্ছিল পৃথিবীর শেষ দিন’— রুশ হামলায় বিধ্বস্ত কিয়েভ-দিনিপ্রো, হতাহত শতাধিক

ইউক্রেনের রাজধানী Kyiv-এ মঙ্গলবার ভোররাতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে বহু আবাসিক এলাকা। গত তিন সপ্তাহে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *