দহগ্রাম সীমান্তে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাকে ঘিরে বাংলাদেশ ও ভারতের সামাজিক মাধ্যমে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী Border Security Force সীমান্ত এলাকায় জমি জরিপের কাজ করতে গেলে Border Guard Bangladesh-এর কিছু সদস্য আপত্তি তোলেন। ভিডিওতে দেখা যায়, বিজিবির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে—“১৫০ গজের মধ্যে কোনও কাজ করা যাবে না” এবং সীমান্তে কোনও কার্যক্রম শুরুর আগে তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।
ভিডিওটি দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। বাংলাদেশের একাংশের কাছে এটি “কঠোর অবস্থান” বা “দেশপ্রেমের প্রতীক” হিসেবে তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে বিএসএফ সদস্যদের দেখা যায়, তারা তর্কে না গিয়ে সাময়িকভাবে এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। কিন্তু এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে আবেগতাড়িত প্রচার চালানো হচ্ছে, তার আড়ালে প্রকৃত আইনি ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা কী?
১৯৭২ সালের ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি: কী ছিল আসল বিষয় ?
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯ মার্চ ১৯৭২ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী Indira Gandhi এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি Sheikh Mujibur Rahman-এর মধ্যে একটি শান্তি ও সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা “ইন্দিরা-মুজিব প্যাক্ট” নামে পরিচিত।
চুক্তিতে মোট ১২টি অনুচ্ছেদ ছিল। সেখানে দুই দেশের সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা, শান্তি ও সহযোগিতার বিষয় গুরুত্ব পেয়েছিল। সীমান্ত প্রসঙ্গ এলেও কোথাও “১৫০ গজের মধ্যে স্থাপনা করা যাবে না” বা “কাঁটাতারের বেড়া নিষিদ্ধ” — এমন কোনও নির্দিষ্ট শর্ত ছিল না।
অর্থাৎ, বর্তমানে সামাজিক মাধ্যমে যে বক্তব্য প্রচার করা হচ্ছে, তার সরাসরি ভিত্তি ১৯৭২ সালের চুক্তিতে নেই।
১৯৭৪ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তি ও তিনবিঘা করিডর
এরপর ১৬ মে ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক ভারত-বাংলাদেশ স্থলসীমান্ত চুক্তি। এই চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকার ডিমারকেশন বা সুনির্দিষ্ট চিহ্নিতকরণ করা হয়।
চুক্তির ১৪ নম্বর ধারায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয় দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহল এবং তিনবিঘা করিডরের প্রসঙ্গ। সেখানে বলা হয়েছিল—
* দহগ্রাম ও আঙ্গরপোতা বাংলাদেশের অধীনে থাকবে।
* ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার তিনবিঘা এলাকা বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি লিজে দেওয়া হবে।
* এই করিডরের মাধ্যমে বাংলাদেশের পাটগ্রাম থানার পানবাড়ি মৌজার সঙ্গে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার যোগাযোগ নিশ্চিত করা হবে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই চুক্তিতেও “১৫০ গজ দূরে কোনও নির্মাণ করা যাবে না” — এমন কোনও বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক শর্ত ছিল না।
তাহলে ১৫০ গজের বিষয়টি কোথা থেকে এলো ?
এই বিতর্কের মূল উৎস আসলে পরবর্তী সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নীতি। ২০১১ সালে বিএসএফ ও বিজিবির মহাপরিচালক পর্যায়ের আলোচনার ভিত্তিতে “India-Bangladesh Coordinated Border Management Plan” গৃহীত হয়।
সেখানে সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে ১৫০ গজের মধ্যে স্থায়ী প্রতিরক্ষা কাঠামো না তৈরির বিষয়টি সীমান্ত ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে আলোচিত হয়। মূল উদ্দেশ্য ছিল—
* সীমান্তবাসীর স্বাভাবিক কৃষিকাজ চালু রাখা,
* দুই দেশের স্থানীয় জনগণের যাতায়াত ও জীবিকায় সমস্যা কমানো,
* সীমান্তে উত্তেজনা কমানো।
অর্থাৎ এটি কোনও একতরফা আন্তর্জাতিক আইন নয়, বরং দুই দেশের মধ্যে সমঝোতাভিত্তিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নীতি।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যেখানে ভৌগোলিক বা বাস্তব পরিস্থিতির কারণে ১৫০ গজ ফাঁকা রাখা সম্ভব নয়, সেখানে ব্যতিক্রমের সুযোগ রাখা হয়েছে।
দহগ্রামে আসলে কী হচ্ছিল?
সাম্প্রতিক ঘটনায় বিএসএফ মূলত সীমান্ত এলাকায় জমি জরিপের কাজ করছিল। পশ্চিমবঙ্গে সীমান্তে দ্রুত কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সেই কারণে শূন্যরেখা থেকে মাপজোকের কাজ চলছিল।
এই পরিস্থিতিতে বিজিবির কিছু সদস্য প্রকাশ্যে আপত্তি তোলেন এবং ঘটনাটি ভিডিও করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। সমালোচকদের মতে, এই ভিডিওর মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে—বাংলাদেশ “আর নরম নীতি মানছে না” এবং সীমান্তে “কঠোর অবস্থান” নিচ্ছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, দহগ্রাম-তিনবিঘার মতো সংকীর্ণ সীমান্ত এলাকায় ১৫০ গজ নিয়ম হুবহু প্রয়োগ সবসময় সম্ভব নয়। অতীতে একই এলাকায় বহুবার দুই দেশের মধ্যে আলোচনা করে বাস্তবভিত্তিক সমাধান করা হয়েছে।
সীমান্ত রাজনীতি ও আবেগের ব্যবহার
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত বহু বছর ধরেই আবেগ, জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক প্রচারের বিষয়। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমের যুগে সীমান্তের ছোটখাটো ঘটনাও দ্রুত “জাতীয় সম্মান” বা “কূটনৈতিক যুদ্ধ”-এ রূপ পায়।
বাংলাদেশে একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরেই ভারতবিরোধী আবেগকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে। অন্যদিকে ভারতেও সীমান্ত রাজনীতি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বক্তব্যের অংশ হয়ে ওঠে।
ফলে সীমান্তের বাস্তব প্রশাসনিক বা কারিগরি বিষয়গুলো অনেক সময় আবেগের চাপে চাপা পড়ে যায়।
বাস্তবতা বনাম প্রোপাগান্ডা
১৯৭৪ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তি, ২০১১ সালের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা এবং ২০১৫ সালের ছিটমহল বিনিময়—সব মিলিয়ে ভারত ও বাংলাদেশ সীমান্ত সমস্যার বহু জটিল সমাধান আলোচনার মাধ্যমেই করেছে।
২০১৫ সালের ছিটমহল বিনিময়ের ফলে বাংলাদেশ অতিরিক্ত প্রায় ১০ হাজার একর জমি পায়। দুই দেশই এই চুক্তিকে ঐতিহাসিক সমাধান হিসেবে তুলে ধরেছিল।
সেই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে সীমান্তে প্রতিটি প্রশাসনিক কাজকে “যুদ্ধ” বা “জাতীয় অপমান” হিসেবে দেখানো শেষ পর্যন্ত দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকরই হতে পারে।
সীমান্তে উত্তেজনা তৈরি করা সহজ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সীমান্তবাসীর স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিত করতে প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক আলোচনা, কূটনৈতিক সংলাপ এবং দায়িত্বশীল আচরণ।
আবেগ নয়, বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতেই দহগ্রামের ঘটনাকে দেখা উচিত।
Geopulse TV
