জলবায়ু নীতিতে বড় পরিবর্তনের পথে আমেরিকা। জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কার্বন নিঃসরণের উপর থাকা সীমা তুলে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। এর ফলে ২০২৪ সালে জো বাইডেন প্রশাসনের চালু করা নিয়ম বাতিল হতে চলেছে। শুধু পুরনো নিয়ম প্রত্যাহার নয়, ভবিষ্যতে বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে ফেডারেল সরকারের ক্ষমতা নিয়েও নতুন পদক্ষেপ করতে চলেছে ট্রাম্প সরকার।
রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সোমবার জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কার্বন নিঃসরণের সীমা বাতিল করার ঘোষণা দিতে পারে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলি আমেরিকার মোট জলবায়ু দূষণের প্রায় এক-চতুর্থাংশের জন্য দায়ী বলে জানা গিয়েছে। বাইডেন প্রশাসন ২০২৪ সালে কয়লা ও গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর জন্য কড়া নিয়ম চালু করেছিল। সেই নিয়মে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলিকে সময়ের সঙ্গে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে বলা হয়েছিল। ব্লুমবার্গ নিউজ এবং নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট দুটি নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার পর্যালোচনা শুক্রবার শেষ করেছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ। হিউস্টনে জি-২০ জ্বালানি মন্ত্রীদের বৈঠকে মার্কিন পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা বা ইপিএর প্রশাসক লি জেলডিন এই পরিবর্তনের ঘোষণা করতে পারেন।
প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ২০২৪ সালের বাইডেন আমলের মানদণ্ড প্রযুক্তিগতভাবে প্রত্যাহার করা হবে। ‘Clean Air Act’-র অধীনে বিদ্যমান কয়লাচালিত এবং নতুন গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য এই নিয়ম তৈরি হয়েছিল। ইপিএর একটি খসড়া বিধিতে বলা হয়েছে, ওই মানদণ্ড পূরণ করা বাস্তবে সম্ভব নয় এবং তা কার্যকর করার সময়সীমাও অত্যন্ত কম। দ্বিতীয় পদক্ষেপটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্তাবিত নতুন নিয়মে ইপিএ বিদ্যুৎ খাত থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করার আইনি ক্ষমতা রাখে কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন তোলা হতে পারে। এর ভিত্তি তৈরি হয়েছে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সরকারের নেওয়া একটি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। সেই সিদ্ধান্তে ২০০৯ সালের ‘এনডেঞ্জারমেন্ট ফাইন্ডিং’ বাতিল করা হয়। ওই বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তে বলা হয়েছিল, গ্রিনহাউস গ্যাস জনস্বাস্থ্য ও জনকল্যাণের জন্য হুমকি তৈরি করে।
তবে এই দুটি পদক্ষেপের আইনি যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ন্যাচারাল রিসোর্সেস ডিফেন্স কাউন্সিলের আইন বিশেষজ্ঞ মেরেডিথ হ্যাঙ্কিন্সের মতে, দুটি সিদ্ধান্তের আইনি ভিত্তির মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে। তাঁর বক্তব্য, খসড়া পর্যায়ের নথিতে ইপিএর গ্রিনহাউস গ্যাস নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা স্বীকার করা হলেও একই সঙ্গে বলা হচ্ছে, বাইডেন প্রশাসন সেই ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভুল পথে এগিয়েছিল। ফলে চূড়ান্ত নিয়ম প্রকাশের পর বিষয়টি আদালতে গড়াতে পারে। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনকে ‘ধাপ্পাবাজি’ বলে অভিহিত করে এসেছেন। তাঁর প্রশাসনের জলবায়ু নীতি পরিবর্তনের মধ্যে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে আমেরিকাকে ফের সরিয়ে নেওয়া এবং যানবাহনের নিষ্কাশন গ্যাস থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ সংক্রান্ত মানদণ্ড বাতিলের উদ্যোগও রয়েছে।
এদিকে, বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির মধ্যেই এই সিদ্ধান্ত সামনে এসেছে। চলতি বছরের অগস্ট বিশ্বে এখনও পর্যন্ত রেকর্ড করা সবচেয়ে উষ্ণ মাস ছিল। একই সময়ে আমেরিকাও তার উষ্ণতম গ্রীষ্মকাল পার করেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোই মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবেশ বিশেষজ্ঞ মেরেডিথ হ্যাঙ্কিন্সের অভিযোগ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মানুষ প্রতিদিন অনুভব করলেও সরকার সেই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করছে। তাঁর মতে, এই নীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আগামী প্রজন্মকেও বহন করতে হতে পারে।
Geopulse TV
