সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলার পর নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে বিশ্ববাজারে। হামলার জেরে ১,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনটি কয়েক সপ্তাহ কার্যত বন্ধ থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সময়ে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দ্বীপের দখল নেওয়ায় সৌদির তেল রফতানির পথ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে ২ শতাংশের বেশি।
সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন হামলার পর আগামী তিন থেকে পাঁচ সপ্তাহ পর্যন্ত পাইপলাইনটির পরিষেবা অনেকটাই ব্যাহত থাকতে পারে। বিষয়টির সঙ্গে যুক্ত দুই আঞ্চলিক আধিকারিকের উদ্ধৃতি দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস। তাঁদের মতে, বড় একটি পাম্পিং কেন্দ্রে মেরামতির কাজ-সহ পুরো সংস্কার প্রক্রিয়ায় কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। মেরামতির সময় পাইপলাইনের কিছু অংশ চালু রাখা সম্ভব হলেও কত পরিমাণ তেল পরিবহণ করা যাবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। সৌদি আরবের জন্য এই পাইপলাইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল লোহিত সাগরের তীরে ইয়ানবু বন্দরে পৌঁছে দেয়। সেখান থেকে ট্যাঙ্কারে করে তেল রফতানি করা হয়।
বৃহস্পতিবারের হামলার পর পাইপলাইনটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। সৌদি আরবের অভিযোগ, ইরান-সমর্থিত ইরাকের মিলিশিয়াদের ছোড়া ড্রোন থেকেই এই হামলা চালানো হয়েছে। নরওয়ের গবেষণা সংস্থা “রিস্টাড এনার্জি” জানিয়েছে, অগস্টের শেষ দিক থেকে পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২৬ লাখ থেকে ৪০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহণ হচ্ছিল। পুরোপুরি সরবরাহ বন্ধ হলে এই পরিমাণ তেল আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কার্যত হারিয়ে যেতে পারে। এর মধ্যেই ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০৯ ডলারে পৌঁছেছে। এর পাশাপাশি ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সামরিক অগ্রগতিও সৌদির জন্য উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সরকারি ও হুথি সূত্রের দাবি, লোহিত সাগরের কৌশলগত গ্রেটার হানিশ ও লেসার হানিশ দ্বীপের দখল নিয়েছে হুথিরা। এই দ্বীপগুলি বাব এল-মান্দেব প্রণালীর কাছাকাছি। এই জলপথ লোহিত সাগরকে খোলা সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত করে এবং সৌদির এশীয় বাজারে তেল পাঠানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
গত সপ্তাহে হুথিরা বাব এল-মান্দেব প্রণালীর ভিতরে থাকা মাউন দ্বীপ এবং বন্দর শহর মোখারও দখল নেয়। রবিবার ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী মোখা, ধুবাব এবং তাইজ প্রদেশের অন্য কয়েকটি এলাকায় হুথি ঘাঁটি লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে। হুথি মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, সৌদির দক্ষিণাঞ্চলের “খামিস মু-শাইত-এ কিং খা-লিদ এয়ার বেস” লক্ষ্য করে কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়া হয়েছে। সৌদি সামরিক মুখপাত্রের দাবি, হামলায় ১৩ জন সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন এবং কয়েকটি বাড়ি ও গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে বিমানঘাঁটি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না, তা তিনি জানাননি।
ইরান যুদ্ধের জেরে সৌদি আরবের তেল উৎপাদন ও রফতানি ব্যবস্থাতেও চাপ তৈরি হয়েছে। “ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি” জানিয়েছে, গত অগস্টে সৌদির তেল উৎপাদন কমে দৈনিক প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেলে নেমেছিল। ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধ থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। লোহিত সাগরে হুথি হামলার কারণে ইয়ানবু থেকে এশিয়ার বাজারে তেল পাঠাতেও সময় ও খরচ বেড়েছে। ফলে পাইপলাইনটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ নতুন করে পুনর্বিন্যাস করতে হতে পারে বলে সতর্ক করেছে “রিস্টাড এনার্জি”।
এদিকে, ইয়েমেনে সংঘর্ষও আরও তীব্র হচ্ছে। ২০২২ সালের পর যে যুদ্ধবিরতি মোটামুটি বজায় ছিল, তার পর ফের পূর্ণমাত্রার গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে ইয়েমেনে ৫০০-র বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ৯৪ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ফলে সৌদির গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইনে হামলা এবং লোহিত সাগরের কৌশলগত এলাকাগুলিতে হুথিদের অগ্রগতির দুই ঘটনাই আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ ব্যবস্থার উপর নতুন করে চাপ তৈরি করেছে।
Geopulse TV
