চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সরকারি গোপন তথ্য সংগ্রহের জন্য চীনা সামরিক গোয়েন্দারা একটি সুপরিকল্পিত নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে বলে বিরল যৌথ সতর্কতা জারি করেছে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী গোয়েন্দা জোট ‘ফাইভ আইজ’। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো একযোগে এই সতর্কবার্তা প্রকাশ করেছে।
“Safeguarding Our Secrets” শীর্ষক যৌথ বুলেটিনটি প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের FBI, যুক্তরাজ্যের MI5, কানাডার CSIS, অস্ট্রেলিয়ার ASIO এবং নিউজিল্যান্ডের NZSIS। পশ্চিমা বিশ্বের গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের মূল ভিত্তি হিসেবে পরিচিত ‘ফাইভ আইজ’ জোটের পক্ষ থেকে এটি চীনের চলমান গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে সবচেয়ে স্পষ্ট ও প্রকাশ্য সতর্কতাগুলোর একটি।
বুলেটিনে বলা হয়েছে, চীনা সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে নিজেদের মানবসম্পদ (HR) পরামর্শক বা নিয়োগকারী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেন। তারা চীনের বাইরে অবস্থিত বলে দাবি করা বিভিন্ন কথিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে কাজ করেন এবং জনপ্রিয় চাকরির প্ল্যাটফর্মে আকর্ষণীয় পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন।
এই কাজে LinkedIn, Indeed এবং Upwork-এর মতো বহুল ব্যবহৃত প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে নিয়োগের লক্ষ্য সাধারণ চাকরিপ্রার্থী নয়। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, নিরাপত্তা ছাড়পত্রধারী সরকারি কর্মকর্তা, প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ, সামরিক সদস্য এবং বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সামরিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরাই প্রধান টার্গেট।
তবে তালিকা এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, সাংবাদিক, থিংক ট্যাংক বিশ্লেষক এবং ফ্রিল্যান্স লেখকরাও এই নেটওয়ার্কের নজরে থাকেন, যদি তাদের কাজের সঙ্গে সরকারি নীতি বা প্রতিরক্ষা বিষয়ের সামান্যও সম্পর্ক থাকে।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে পরিচালিত হয়। প্রথমে চাকরির আবেদন গ্রহণ করা হয়, এরপর অনলাইনে সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। এই সময় নিয়োগকারীরা নিজেদের প্রকৃত পরিচয় গোপন রেখে প্রার্থীর সরকারি যোগাযোগ, সামরিক কার্যক্রম বা সংবেদনশীল তথ্যের নাগাল সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেন।
পরবর্তী ধাপে প্রার্থীদের চীনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বা ইন্দো-প্যাসিফিক প্রতিরক্ষা ইস্যু নিয়ে একটি পরীক্ষামূলক প্রতিবেদন লিখতে বলা হয়। দেখতে সাধারণ কাজ মনে হলেও এটি আসলে ব্যক্তির সক্ষমতা ও সহযোগিতার মানসিকতা যাচাইয়ের একটি পদ্ধতি।
একবার যোগাযোগ স্থাপিত হলে ধীরে ধীরে আরও সংবেদনশীল বা অপ্রকাশিত তথ্য চাওয়া শুরু হয়। যোগাযোগ সরিয়ে নেওয়া হয় এনক্রিপ্টেড মেসেজিং প্ল্যাটফর্মে এবং প্রতিটি প্রতিবেদনের বিনিময়ে কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। অর্থ পাঠানো হয় PayPal, Wise, Zelle কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে, অনেক ক্ষেত্রে এমন ব্যক্তিদের অ্যাকাউন্ট থেকে যাদের সঙ্গে নিয়োগপ্রাপ্তদের কখনও দেখা হয়নি।
ফাইভ আইজ সতর্ক করেছে, এই ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার পরিণতি গুরুতর হতে পারে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছে, চাকরি হারাতে হয়েছে এবং নিরাপত্তা ছাড়পত্র বাতিল করা হয়েছে।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, এমনকি আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ বা অশ্রেণিবদ্ধ তথ্যও বিভিন্ন উৎসের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা চিত্র তৈরি করতে পারে। এ কারণেই তারা চাকরিপ্রার্থীদের আরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে এবং যুক্তরাজ্যের National Protective Security Authority প্রকাশিত “Applicant Beware” নির্দেশিকা অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছে।
Geopulse TV
