জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী মহলে এক পুরোনো ঐতিহাসিক বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে। অনুষ্ঠানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের ‘পরীক্ষিত বন্ধু’ হিসেবে অভিহিত করেন। কূটনৈতিক সৌজন্য আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অংশ হলেও, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত সংকটের কথা উল্লেখ না করে এই ধরনের মন্তব্য ইতিহাসকে রাজনৈতিক সুবিধার্থে ব্যাখ্যা করার ঝুঁকি তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি দল, যাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা এখনও বিতর্কিত, তারা যখন ১৯৭১ সালে ওয়াশিংটনের ভূমিকা নিয়ে নীরব থেকে ‘স্থায়ী বন্ধুত্বের’ ভাষা ব্যবহার করে, তখন তা ইতিহাসের সামঞ্জস্য নিয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলে।
এই অনুষ্ঠানটি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছে দেশের বামপন্থী রাজনৈতিক দল ও বুদ্ধিজীবী মহল। তাদের মতে, সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে এমন আয়োজন বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি বেদনাদায়ক অধ্যায়কে উপেক্ষা করেছে এবং এটি দেশে ‘যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের’ বহিঃপ্রকাশ, যা সার্বভৌম স্বার্থের পরিপন্থী। ইতিহাসবিদদের মতে, ১৯৭১ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের প্রশাসন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংসতার স্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও ঢাকাকে রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থন দিয়েছিল, যা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বড় নৈতিক ব্যর্থতা। তবে মার্কিন সরকারের ভেতরেই এর তীব্র বিরোধিতা হয়েছিল। ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড এবং তাঁর সহকর্মীরা ঐতিহাসিক ‘ব্লাড টেলিগ্রামে’ ওয়াশিংটনের এই নীতিকে ‘নৈতিক দেউলিয়াত্ব’ বলে আখ্যা দেন। গ্যারি জে. ব্যাসের ‘The Blood Telegram’ গ্রন্থেও এই গণহত্যার নথিবদ্ধকরণ ও ওয়াশিংটনের কৌশলগত নীরবতার বিবরণ রয়েছে। এমনকি ১৯৭১-এর ডিসেম্বরে মার্কিন প্রশাসন বঙ্গোপসাগরে পারমাণবিক শক্তিচালিত রণতরী ‘ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ’ পাঠিয়ে স্বাধীনতাকামী শক্তিকে ভয় দেখানোর প্রচেষ্টাও চালিয়েছিল।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, ১৯৭১ সালের মার্কিন নীতিকে কেবল নিক্সন প্রশাসনের কর্মকাণ্ড দিয়ে বিচার করা ঠিক নয়। হোয়াইট হাউস পাকিস্তানের পাশে দাঁড়ালেও বহু আমেরিকান নাগরিক, লেখক ও শিল্পী বাঙালি জনগণের পাশে ছিলেন। অ্যালেন গিন্সবার্গ কবিতার মাধ্যমে শরণার্থীদের দুর্ভোগ তুলে ধরেন, জোয়ান বায়েজ কণ্ঠে প্রতিবাদ জানান এবং জর্জ হ্যারিসন ও রবি শঙ্কর ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর মাধ্যমে বৈশ্বিক মনোযোগ আকর্ষণ ও তহবিল সংগ্রহ করেন। বাংলাদেশের বিজয়ের পর অবশ্য ওয়াশিংটন তার নীতি পরিবর্তন করে এবং ১৯৭৩ সাল নাগাদ দেশের বৃহত্তম দ্বিপাক্ষিক সাহায্যদাতা হিসেবে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে বড় ভূমিকা রাখে। তাই মার্কিন প্রশাসন ও আমেরিকান জনগণের মধ্যকার এই পার্থক্যটি বোঝা জরুরি। বর্তমান বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের পরিণত ও গঠনমূলক অংশীদারিত্ব উদযাপন করা সম্পূর্ণ বৈধ হলেও, ঐতিহাসিক সত্যকে আড়াল করে বা স্মৃতিচারণের সুবিধাজনক ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে ইতিহাসকে নতুন করে সাজানো অনুচিত। একটি শক্তিশালী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কঠিন সত্যকে ভুলে যাওয়ার ওপর নয়, বরং সততার সঙ্গে তার মুখোমুখি হওয়ার ওপরই নির্মিত হয়।
Geopulse TV
