হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের উপর হামলার ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে। অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাতে সিঙ্গাপুরে নথিভুক্ত দুটি কন্টেনারবাহী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে একটি জাহাজে আগুন ধরে যাওয়ার পর সেটি ডুবে যায়। অন্য জাহাজটিরও ক্ষতি হয়েছে। তবে দুই জাহাজের মোট ৪৩ জন কর্মীই নিরাপদে রয়েছেন। এই ঘটনার পর গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কড়া বার্তা দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি।
সিঙ্গাপুরের মেরিটাইম অ্যান্ড পোর্ট অথরিটি জানিয়েছে, GFS PRIDE এবং GFS GISELLE নামে দুটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রথম জাহাজ GFS PRIDE-এ আঘাত লাগার পর আগুন ধরে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় জাহাজটি শেষ পর্যন্ত ডুবে যায়। ওই জাহাজে ২১ জন কর্মী ছিলেন। তাঁরা সকলেই নিরাপদে জাহাজ থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। এই ঘটনায় কেউ আহত হননি। অন্যদিকে, GFS GISELLE জাহাজটির বাইরের অংশে ক্ষতি হয়েছে। তবে আঘাতের পরও জাহাজটি চলাচলের ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়। নিজস্ব ইঞ্জিনের সাহায্যে সেটি নিরাপদ নোঙরস্থলে পৌঁছয়। জাহাজটিতে থাকা ২২ জন কর্মীও নিরাপদে রয়েছেন। সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, দুটি জাহাজের কোনওটিতেই সিঙ্গাপুরের নাগরিক ছিলেন না। এই ঘটনার পর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সিঙ্গাপুরের মেরিটাইম অ্যান্ড পোর্ট অথরিটি। তাদের বক্তব্য, ওই অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজের উপর হামলার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিপুল পরিমাণ তেল ও অন্যান্য পণ্য পরিবহণ করা হয়। এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে, হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কড়া অবস্থান জানিয়েছে ইরানের আইআরজিসি নৌবাহিনী। বাহিনীর কমান্ডার আলি আজমাই জানিয়েছেন, পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালি এবং ওমান উপসাগরে ইরানের নৌবাহিনী ও আইআরজিসি-র নৌবাহিনী দিনরাত নজরদারি চালাচ্ছে। অর্থাৎ, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে ইরানের সামরিক নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। আলি আজমাই আরও জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে এই জলপথ দিয়ে চলাচল করতে হলে জাহাজগুলিকে আগে অনুমতি নিতে হবে। তাঁর দাবি, অনুমতি ছাড়া কোনও জাহাজ চলাচল করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। বিশেষ করে আমেরিকার উস্কানিতে কোনও জাহাজ নিয়ম ভাঙলে তার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ করা হবে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
উল্লেখ্য, হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তেল ও গ্যাস পরিবহণের ক্ষেত্রে এই জলপথের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এখানে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে তার প্রভাব শুধু পশ্চিম এশিয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম, পরিবহণ খরচ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও তার প্রভাব পড়তে পারে। সব মিলিয়ে, সিঙ্গাপুরের দুটি জাহাজে হামলা, একটি জাহাজের ডুবে যাওয়া এবং ইরানের কড়া অবস্থান হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আগামী দিনে এই জলপথে উত্তেজনা কমে কি না, এখন সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।
Geopulse TV
