উত্তর নাইজেরিয়ায় শিশুদের মধ্যে ভয়াবহ আকারে দেখা দিচ্ছে ‘নোমা’ নামের এক অবহেলিত রোগ। মুখ ও মুখগহ্বরের এই দ্রুত ছড়িয়ে পড়া সংক্রমণ অল্প সময়ের মধ্যেই মুখের নরম টিস্যু ও হাড় ধ্বংস করে দিতে পারে। চিকিৎসা না হলে আক্রান্ত অধিকাংশ শিশুরই মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে।
নাইজেরিয়ার সোকোটো রাজ্যের নোমা চিলড্রেন হাসপাতালের চিকিৎসকদের কাছে আসা শিশুদের বড় একটি অংশ অপুষ্টি ও দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারের। সাধারণত ২ থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুরা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হয়।
তিন বছর বয়সে নোমায় আক্রান্ত হয়েছিল ইব্রাহিম দালহাতু। ২০২১ সালে সোকোটোর নোমা চিলড্রেন হাসপাতালে তার প্রথম অস্ত্রোপচার হয়। বর্তমানে আট বছর বয়সী ইব্রাহিমকে সুস্থ করে তুলতে এ পর্যন্ত ছয়বার অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। চিকিৎসার পর এখন সে স্বাভাবিকভাবে খেতে ও কথা বলতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) নোমাকে অবহেলিত ক্রান্তীয় রোগ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। সংস্থাটির মতে, দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা গেলে এই রোগের ভয়াবহতা অনেকটাই কমানো সম্ভব। প্রাথমিক পর্যায়ে অ্যান্টিবায়োটিক, ক্ষত পরিচর্যা ও পুষ্টি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। তবে রোগ গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছালে প্রয়োজন হয় অস্ত্রোপচারের।
নোমার অন্যতম বড় ঝুঁকি হলো চরম দারিদ্র্য ও মারাত্মক অপুষ্টি। দূষিত পরিবেশে বসবাসকারী অপুষ্ট শিশুর মাড়িতে প্রদাহ থেকে সংক্রমণ শুরু হয়ে দ্রুত মুখের অন্যান্য টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় সোকোটোর হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১৯৯৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত উত্তর নাইজেরিয়ার ১২টি রাজ্যে ৫০ হাজারের বেশি নোমা রোগীর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
নাইজেরিয়ায় নোমা আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি নথিভুক্ত হওয়ার পেছনে দেশটির বিশেষায়িত হাসপাতাল, বড় জনসংখ্যা এবং সরকারি পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ ব্যবস্থাকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চিকিৎসা সহায়তায় কাজ করছে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা Doctors Without Borders (MSF)। সংস্থাটি বিনামূল্যে ধাপে ধাপে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দিচ্ছে। সোকোটোর বিশেষায়িত হাসপাতালে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ৫০০-র বেশি নোমা আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসা হয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, অনেক শিশুকে হাসপাতালে আনা হয় রোগ অনেকটা এগিয়ে যাওয়ার পর। ফলে মুখের টিস্যু ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পরবর্তীতে জটিল পুনর্গঠনমূলক অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নোমা শুধু একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়—এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে দারিদ্র্য, অপুষ্টি, স্বাস্থ্যসচেতনতার অভাব এবং চিকিৎসাসেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার। আফ্রিকার পশ্চিম থেকে পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকাকে অনেক সময় ‘নোমা বেল্ট’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।
Geopulse TV
