বিশ্বজুড়ে যখন একের পর এক সংঘাত, বাণিজ্যিক চাপ এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ছে, তখন ভারতের বিদেশনীতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিলেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করতে হলে তাৎক্ষণিক বা আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়ার বদলে প্রয়োজন ‘বিবেচনাপ্রসূত হিসেব’ (considered calculation)। মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্সের (ICWA) ২৫তম বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি এবং ভারতের সামনে তৈরি হওয়া নানা পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য রাখেন তিনি।
জয়শঙ্কর বলেন, বর্তমানে উপসাগরীয় অঞ্চল এবং ইউক্রেন এই দুই জায়গাতেই বড় সংঘাত চলছে। দুই ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্ক রয়েছে। ফলে কোনও একটি পক্ষের দিকে সরাসরি ঝুঁকে না গিয়ে বিভিন্ন স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে কৌশল নির্ধারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।বিদেশমন্ত্রী বলেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে ‘সবকিছুর অস্ত্রায়ন’ দেখা যাচ্ছে। অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং শুল্কনীতিও ক্রমশ কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিভিন্ন দেশের শুল্কনীতিতে অস্থিরতা বাড়ছে, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য ডাম্পিংয়ের মতো সমস্যাও তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় ভারতকে পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের কৌশল বারবার পর্যালোচনা ও প্রয়োজনমতো পরিবর্তন করতে হবে।
জয়শঙ্করের কথায়, ভারতের স্বার্থ যেমন বেড়েছে, তেমনই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দেশের যোগাযোগ ও অংশীদারিত্বও প্রসারিত হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যত জটিল হচ্ছে, ভারতের নীতিনির্ধারণেও তত বেশি হিসেব-নিকেশের প্রয়োজন রয়েছে। অনেক সময় সমস্যার সমাধান নতুন কোনও নীতি গ্রহণের মধ্যে নয়, বরং বর্তমান কৌশলকে আরও কার্যকরভাবে সাজানোর মধ্যেই থাকে।
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে ভারতের কৌশল কতটা কার্যকর হয়েছে, তা বোঝার জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে মাপকাঠি হিসেবে দেখার কথা বলেন বিদেশমন্ত্রী। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি নিরাপত্তা, রফতানি, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং বিদেশে থাকা ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা।
তিনি জানান, বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির ব্যবস্থা করায় সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে এবং খরচও নিয়ন্ত্রণে রাখা গিয়েছে। নতুন অংশীদার, নতুন বাজার এবং নতুন বাণিজ্যপথ ভারতের রফতানিকে সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি তা সম্প্রসারণেও সাহায্য করেছে। একইভাবে সরবরাহ শৃঙ্খলেও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুফল মিলেছে। বিদেশে থাকা ভারতীয়দের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও সঠিক নীতিগত সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে বলে জানান তিনি।
জয়শঙ্কর আরও বলেন, বর্তমানে ভারত বিশ্বের অনেক বেশি সংখ্যক দেশ ও অঞ্চলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। দেশের স্বার্থ এখন ক্রমশ বৈশ্বিক হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে ভারতের দায়িত্ব এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেশটির প্রতি প্রত্যাশাও বেড়েছে। বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের বিভিন্ন সমস্যার ক্ষেত্রে ভারত আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের অবস্থান তুলে ধরছে। ভারতের বৈশ্বিক ভূমিকা যত বাড়ছে, আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে দেশের বৌদ্ধিক ও কৌশলগত আলোচনাকেও সেই অনুযায়ী এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন বিদেশমন্ত্রী। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রচলিত আলোচনায় এতদিন বিশ্বের অন্য অংশের অভিজ্ঞতা ও ধারণার প্রভাব বেশি ছিল। কিন্তু ভারত একটি শক্তিশালী বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে উঠে আসার সঙ্গে সঙ্গে নিজের ইতিহাস, অভিজ্ঞতা, স্বার্থ, ধারণা এবং পরিভাষার ভিত্তিতেও বিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে হবে। বর্তমান অস্থির আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল প্রতিটি পরিস্থিতিকে ঠান্ডা মাথায় বিচার করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। সংঘাত, শুল্ক, বাণিজ্য, জ্বালানি এবং সরবরাহ শৃঙ্খল প্রতিটি ক্ষেত্রেই দ্রুত প্রতিক্রিয়ার বদলে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল এবং নিয়মিত পর্যালোচনার উপর জোর দিয়েছেন জয়শঙ্কর।
Geopulse TV
