জ্বালানির দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছনোয় গভীর সঙ্কটের মুখে পাকিস্তান। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সরকারকে সতর্ক করেছেন দেশের মন্ত্রীরা। হরমুজ প্রণালী ও বাব এল মন্দেব প্রণালীর আশপাশে জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের জেরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। তার প্রভাব পড়ছে পাকিস্তানের জ্বালানি সরবরাহ এবং অর্থনীতিতে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পেট্রোলিয়াম পণ্যের ব্যবহার কমানোর উপায় খতিয়ে দেখছে সরকার।
পাকিস্তানে পেট্রোল ও হাই স্পিড ডিজেলের দাম নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে। মঙ্গলবার রাতে পেট্রোলের দাম লিটার প্রতি ৪.১০ পাকিস্তানি টাকা এবং হাই স্পিড ডিজেলের দাম ৬.৪১ পাকিস্তানি টাকা বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে পেট্রোলের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে লিটার প্রতি ৩৮৪.৩৪ পাকিস্তানি টাকা। ডিজেলের দাম হয়েছে ৪১৫.৮৩ পাকিস্তানি টাকা প্রতি লিটার। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে এই মূল্যবৃদ্ধি পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের উপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব কিছুটা কমাতে সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানি সহায়তা প্রকল্প চালু রাখা হয়েছে। পাকিস্তানের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী মুসাদ্দিক মালিক জানিয়েছেন, সরকার মূল্যবৃদ্ধির একটি অংশের চাপ নিজেদের উপর নেওয়ার চেষ্টা করছে। এই প্রকল্পের আওতায় মোটরবাইক ব্যবহারকারীদের সপ্তাহে পাঁচ লিটার পর্যন্ত পেট্রোলে ভর্তুকি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। গাড়ির মালিকদের জন্য প্রতি দশ দিনে ১০ লিটার পর্যন্ত জ্বালানিতে সহায়তা দেওয়া হবে। তবে এই সহায়তা জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পুরো চাপ সামলাতে পারবে না বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রী।
এদিকে পাকিস্তানের বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎমন্ত্রী আওয়াইস লেঘারি জানিয়েছেন, জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা তৈরি হলেও দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলি সচল রাখতে দেশীয় জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। আগস্ট মাসে পাকিস্তানের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৭২ শতাংশ এসেছে দেশীয় উৎস থেকে। এর মধ্যে জলবিদ্যুৎ, দেশীয় কয়লা, পারমাণবিক শক্তি, দেশীয় গ্যাস, বায়ুশক্তি এবং সৌরবিদ্যুৎ রয়েছে। বাকি ২৮ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আমদানি করা কয়লা ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের উপর নির্ভর করতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় পাকিস্তানের বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচও বাড়ছে। মন্ত্রী জানিয়েছেন, এলএনজি সরবরাহে বিঘ্নের কারণে স্পট মার্কেটে গ্যাসের দাম প্রতি MMBtu ২৩.২৫ ডলারে পৌঁছেছে। দেশীয় গ্যাসের ব্যবহার বাড়িয়ে পাকিস্তান আরও ব্যয়বহুল এলএনজি কেনা এড়াতে পেরেছে বলে দাবি তাঁর। দেশীয় গ্যাসের অতিরিক্ত ব্যবহার না হলে দেশে আরও এক ঘণ্টা লোডশেডিং হতে পারত। পাশাপাশি ফার্নেস অয়েল বা আমদানি করা এলএনজির উপর নির্ভরতা বাড়লে বিদ্যুতের গ্রাহক মূল্য প্রায় ১০.৬ বিলিয়ন পাকিস্তানি টাকা বাড়তে পারত বলেও জানিয়েছেন তিনি।
জ্বালানি সঙ্কটের মোকাবিলায় পেট্রোলিয়াম পণ্যের ব্যবহার কমানোর পরিকল্পনা করছে পাকিস্তান সরকার। এর মধ্যে স্মার্ট লকডাউনের মতো পদক্ষেপের কথাও ভাবা হচ্ছে। এর আগে আমেরিকা ও ইরানের সংঘাতের সময় জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য চার দিনের কর্মসপ্তাহ এবং বাজার দ্রুত বন্ধ করার মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে সেই ধরনের কৃচ্ছ্রসাধনমূলক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আত্তা তারার। তবে মুসাদ্দিক মালিক জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে স্মার্ট লকডাউন নিয়ে কোনও আলোচনা হয়নি। সরকারের জ্বালানি সহায়তা প্রকল্প আরও বিস্তৃত করার কাজও চলছে। উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দারের নেতৃত্বে জাতীয় জ্বালানি ভর্তুকি পরিচালন কমিটি পেট্রোল পাম্পগুলিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অর্থ প্রদানের নির্দেশ দিয়েছে। প্রথমে ইসলামাবাদে পরীক্ষামূলক ভাবে চালু হওয়া এই প্রকল্প এখন পাকিস্তানের অন্যান্য এলাকাতেও সম্প্রসারিত করা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির চাপ কিছুটা কমিয়ে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়া।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধি নিয়ে পাকিস্তানে রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে। জামাত-ই-ইসলামি জানিয়েছে, জ্বালানির দাম কমানো না হলে আগামী সপ্তাহে দেশজুড়ে বিক্ষোভ করা হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার মধ্যে পাকিস্তান জুলাই মাস থেকে পেট্রোলিয়াম পণ্যের দাম নির্ধারণের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন এনেছে। আগে সপ্তাহে একবার দাম সংশোধন করা হলেও এখন প্রতিদিনের ভিত্তিতে দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে। বিশ্ববাজারে তেলের দামের দ্রুত ওঠানামার সঙ্গে দেশের বাজারের দাম সামঞ্জস্য রাখতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন বন্ধ হওয়ার খবরও বিশ্ববাজারে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আকাশপথে হামলার পর পাইপলাইনটি বন্ধ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন করে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহের অনিশ্চয়তা পাকিস্তানের অর্থনীতির উপর চাপ আরও বাড়িয়ে তুলছে। পরিবহণ, শিল্প উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রভাব পড়তে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার কী পদক্ষেপ করে, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে।
Geopulse TV
