মালাক্কা প্রণালীর দুয়ারে ভারতের ‘মাস্টারস্ট্রোক’, গ্রেট নিকোবর প্রকল্পে বাড়ছে চীনের উদ্বেগ

ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে অনেক দূরে, কিন্তু থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার উপকূলের অনেক কাছাকাছি অবস্থিত গ্রেট নিকোবর দ্বীপকে ঘিরে শুরু হতে যাচ্ছে নয় বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের অনুমোদন পাওয়া এই উদ্যোগকে সাম্প্রতিক দশকগুলোর মধ্যে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রায় ১৬৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে গড়ে ওঠা গ্রেট নিকোবর প্রকল্পে থাকবে একটি আন্তর্জাতিক ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর, বেসামরিক ও সামরিক উভয় কাজে ব্যবহারের উপযোগী বিমানবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পর্যটন অবকাঠামো এবং সাড়ে তিন লাখ মানুষের জন্য একটি নতুন টাউনশিপ। প্রকল্পটি ধাপে ধাপে আগামী তিন দশকে বাস্তবায়িত হবে এবং প্রথম পর্যায় ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বর্তমানে ভারতের বড় জাহাজ ভিড়ানোর মতো গভীর সমুদ্রবন্দর সীমিত। ফলে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনের একটি বড় অংশ সিঙ্গাপুর ও কলম্বোর মতো বিদেশি বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। নতুন প্রকল্পের আওতায় ১৪.২ মিলিয়ন TEU সক্ষমতার আন্তর্জাতিক কনটেইনার ট্রান্সশিপমেন্ট টার্মিনাল নির্মিত হলে ভারতের এই নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।

তবে প্রকল্পটির গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং কৌশলগতও। গ্রেট নিকোবর দ্বীপটি মালাক্কা প্রণালীর খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। এই প্রণালী ভারত মহাসাগরকে দক্ষিণ চীন সাগরের মাধ্যমে প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হিসেবে বিবেচিত। বিশ্বের প্রায় ২৫ শতাংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং প্রায় ৩০ শতাংশ জ্বালানি পরিবহন এই পথ দিয়ে সম্পন্ন হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের জন্য মালাক্কা প্রণালী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি এবং বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন এই পথের ওপর নির্ভরশীল। বিকল্প হিসেবে ইন্দোনেশিয়ার সুন্দা বা লম্বক প্রণালী ব্যবহার করা গেলেও এতে হাজার হাজার কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হয়, যা সময় ও ব্যয় উভয়ই বাড়িয়ে দেয়।

সাবেক ভারতীয় নৌবাহিনীর ভাইস চিফ শেখর সিনহা আল জাজিরাকে বলেন, গ্রেট নিকোবর এমন একটি অবস্থানে রয়েছে, যেখান থেকে মালাক্কা প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজ চলাচল কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। তার মতে, এটি ভারতের সামুদ্রিক নজরদারি সক্ষমতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

অন্যদিকে সাবেক ব্রিগেডিয়ার ও সামরিক কূটনীতিক সঞ্জয় আইয়ার মনে করেন, গ্রেট নিকোবর প্রকল্প ভারতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সুবিধা তৈরি করবে। তিনি বলেন, শান্তিকালে মালাক্কা প্রণালী অবরোধের প্রশ্নই আসে না, তবে এই অবকাঠামো ভারতের জন্য চীনা PLA নৌবাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণকে অনেক সহজ করবে।

ভারত সরকারও ইতোমধ্যে প্রকল্পটিকে জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা উপস্থিতি এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, গ্রেট নিকোবর প্রকল্প শুধু একটি বন্দর বা উন্নয়ন পরিকল্পনা নয়; বরং এটি ভারত মহাসাগর অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

About Desk 1

Check Also

বন্যাকবলিত নেপালে দ্বিতীয় দফায় ত্রাণ পাঠাল ভারত

আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত নেপালের মানুষের জন্য দ্বিতীয় দফায় মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ মোকাবিলার সামগ্রী পাঠিয়েছে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *