যুক্তরাজ্যে তোলপাড়: মুমূর্ষু কিশোরকে হাতকড়া পরালো পুলিশ, বর্ণবাদের মিথ্যা অজুহাতে খুনি শিখ যুবকের যাবজ্জীবন

যুক্তরাজ্যের (UK) সাউদাম্পটন (Southampton) শহরে এক মর্মান্তিক ও চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের বডি ক্যামেরা ফুটেজ প্রকাশ্যে আসতেই দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। ১৮ বছর বয়সী শ্বেতাঙ্গ কিশোর হেনরি নোয়াককে (Henry Nowak) ছুরিকাঘাত করার পর, উল্টে নিজেকে বর্ণবাদী আক্রমণের শিকার দাবি করে পুলিশকে বিভ্রান্ত করেছিল ২৩ বছর বয়সী ভারতীয় বংশোদ্ভূত শিখ যুবক বিক্রম দিগওয়া (Vickrum Digwa)। সম্প্রতি ব্রিটিশ আদালত বিক্রমকে ন্যূনতম ২১ বছরের মেয়াদসহ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার পর এই ভিডিওটি ভুক্তভোগী পরিবারের অনুমতি নিয়ে জনসমক্ষে আনা হয়।

আমি শ্বাস নিতে পারছি না’: পুলিশের চরম উদাসীনতা

ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, সাউদাম্পটনের একটি আবাসিক রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে কাতরাচ্ছেন সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র হেনরি নোয়াক। তিনি বারবার পুলিশকে বলছেন, “আমি শ্বাস নিতে পারছি না” (I can’t breathe) এবং তাঁকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। কিন্তু কর্তব্যরত পুলিশ অফিসাররা তাঁর আকুতিকে পাত্তাই দেননি।

উল্টে এক অফিসারকে ভিডিওতে বলতে শোনা যায়, “তোমাকে ছুরি মারা হয়েছে? কোথায়? আমার তো মনে হয় না, বন্ধু।” (You’ve been stabbed? Whereabouts? Don’t think you have, mate)। এর পরেই পুলিশ মুমূর্ষু হেনরিকে জোর করে সোজা করার চেষ্টা করে এবং তাঁর হাতকড়া পরায়। কিছুক্ষণ পর তিনি জ্ঞান হারালে পুলিশ তাঁর শরীরের ক্ষতস্থান দেখতে পায়। তখন হাতকড়া খুলে তাঁকে সিপিআর (CPR) দেওয়া শুরু হলেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

মিথ্যা অভিযোগ ও আদালতের রায়

তদন্তে জানা যায়, ঘটনার রাতে বন্ধুদের সাথে বাইরে গিয়েছিলেন হেনরি। সেখানে বিক্রমের সাথে তাঁর বচসা হয়। পুলিশ এলে বিক্রম দাবি করে, সে বর্ণবাদী আক্রমণের শিকার হয়েছে এবং হেনরি তাঁর পাগড়ি (Turban) খুলে চুল টেনেছে। পুলিশ প্রথম দেখায় বিক্রমের কথাই বিশ্বাস করে নেয়।

তবে সাউদাম্পটন ক্রাউন কোর্টের বিচারক উইলিয়াম মাউসলি (Judge William Mousley) এই দাবি সম্পূর্ণ খারিজ করে দিয়ে বিক্রমকে বলেন:

“তুমি একাই এই দাবি করছ, যা হেনরির চরিত্রের সাথে একেবারেই মেলে না।”

বিচারক আরও জানান, ধর্মীয় কারণে শিখদের ছোট কৃপাণ (Kirpan) রাখার অনুমতি থাকলেও, বিক্রম হেনরিকে খুন করতে একটি ২১ সেন্টিমিটার (৮ ইঞ্চি) লম্বা শিখ ডেগার বা ছোরা ব্যবহার করেছিল। এই ঘটনার জেরে নিরপরাধ শিখ সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিচারক।

যুক্তরাজ্য জুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও রাজনৈতিক উত্তাপ

এই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সাউদাম্পটন পুলিশ স্টেশনের বাইরে শত শত মানুষ ‘আই কান্ট ব্রেদ’ স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ দেখায় এবং দাঙ্গা পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়ায়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার (Keir Starmer) বলেন, এই ভিডিও দেখে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত এবং বর্ণবাদের অভিযোগ কীভাবে পুলিশের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করল, তা খতিয়ে দেখা দরকার।

অন্যদিকে, ডানপন্থী দল রিফর্ম ইউকে-র নেতা নাইজেল ফারাজ (Nigel Farage) এটিকে ‘টু-টিয়ার পলিসিং’ (দুই স্তরের পুলিশিং)-এর উদাহরণ বলে দাবি করেন এবং শ্বেতাঙ্গদের প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষকে “তীব্র শীতল ক্ষোভ” (pure cold rage) প্রকাশের আহ্বান জানান।

শান্তি বজায় রাখার আবেদন

তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ (Shabana Mahmood) দুই স্তরের পুলিশিংয়ের তত্ত্ব খারিজ করে দিয়ে বলেন, “ভুল তথ্য এবং উস্কানিমূলক মন্তব্য একটি ভয়াবহ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলছে। আমাদের সবাইকে একযোগে এর নিন্দা করতে হবে।” হ্যাম্পশায়ার এবং আইল অব ওয়াইট কনস্ট্যাবুলারির অফিসারদের ভূমিকা বর্তমানে ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট অফিস ফর পুলিশ কন্ডাক্ট’ (IOPC) তদন্ত করছে। পুলিশ ও ক্রাইম কমিশনার ডোনা জোন্স পুলিশের এই ভূমিকায় দুঃখ প্রকাশ করে এর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

হেনরির বাবা মার্ক নোয়াক (Mark Nowak) জানিয়েছেন, এই ঘটনা বর্ণবাদ বা ধর্মের বিষয় নয়। তিনি চান তাঁর ছেলের মৃত্যুর পর রাস্তাঘাট নিরাপদ হোক, কিন্তু এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমাজে যেন কোনো বিভাজন বা ঘৃণা না ছড়ায়।

উল্লেখ্য, বিক্রমের মা কিরণ কৌর (৫৩)-কেও খুনের অস্ত্র লুকানোর চেষ্টায় অপরাধীকে সাহায্য করার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে, যার সাজা আগামী ১৭ জুলাই ঘোষণা করা হবে।

About Desk 1

Check Also

দুর্নীতি মামলায় ইউক্রেনে ফের রাজনৈতিক চাপ, প্রেসিডেন্টের দফতরের শীর্ষ আধিকারিককে সরালেন জেলেনস্কি

দুর্নীতির তদন্ত ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক চাপের মুখে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। বুধবার প্রেসিডেন্টের দফতরের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *