পাকিস্তান কি সত্যিই “উদীয়মান মধ্যম শক্তি”? নাকি কূটনৈতিক সাফল্যের চকচকে পর্দার আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট? আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের সফল দেখানোর চেষ্টা যতই হোক, বাস্তব ছবিটা কিন্তু অনেক বেশি অন্ধকার। সামরিক সাফল্য বা কূটনৈতিক ভারসাম্যের গল্পের আড়ালে পাকিস্তানের ভিতরে জমছে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিস্ফোরক মিশ্রণ।
সম্প্রতি পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় একটি উত্তর সম্পাদকীয় লিখেছেন, স্টেট ব্যাঙ্ক অফ পাকিস্তানের প্রাক্তন গভর্নর ইশরাত হোসেন। তাঁর বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে যেমন কিছু প্রশংসা রয়েছে, তেমনই রয়েছে একের পর এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা। আর এই সতর্কবার্তাগুলিই এখন পাকিস্তানের প্রকৃত বাস্তবতা তুলে ধরছে।
প্রতিবেদনেই স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তার অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ভিত্তি। অর্থাৎ সামরিক শক্তি থাকলেও অর্থনীতির ভিত নড়বড়ে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দেশটির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এখনও বিদেশি আমানত ও “বন্ধু রাষ্ট্রের সাহায্য”-র উপর নির্ভরশীল। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের আমানত তুলে নেওয়ার পর পাকিস্তানকে সেই ঘাটতি পূরণে সৌদি আরবের উপর নির্ভর করতে হয়েছে। অর্থাৎ পাকিস্তানের অর্থনীতি এমন অবস্থায় দাঁড়িয়ে যেখানে নিজস্ব রিজার্ভের উপর ভরসা করার বদলে বিদেশি টাকার অক্সিজেনে বেঁচে থাকতে হচ্ছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিবেদনে সরাসরি বলা হয়েছে — “Reliance on short-term financial inflows from friendly countries or on geopolitical rents must be phased out.” অর্থাৎ স্বল্পমেয়াদি বিদেশি অর্থসাহায্যের উপর নির্ভরতা বন্ধ করতে হবে। কারণ এই নির্ভরশীলতা অর্থনৈতিক সংস্কারকে থামিয়ে দিয়েছে এবং দেশকে আরও দুর্বল করেছে।
এখানেই শেষ নয়। পাকিস্তানের বর্তমান সামাজিক পরিস্থিতির ছবিটাও অত্যন্ত ভয়াবহ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে। একটি দেশ যখন নিজেকে আন্তর্জাতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায়, তখন সেই দেশের প্রায় অর্ধেক জনগণ দারিদ্র্যের মধ্যে থাকাটা ভয়ঙ্কর বাস্তবতা। শুধু দারিদ্র্য নয়, লিঙ্গ বৈষম্য ও আঞ্চলিক বৈষম্যও মারাত্মক আকার নিয়েছে। মানব উন্নয়ন সূচকে পাকিস্তান মাঝারি স্তর থেকে নিচের স্তরে নেমে গেছে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অবস্থাও করুণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাক্ষরতার হার কম, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির সূচক অত্যন্ত খারাপ। অর্থাৎ পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ প্রজন্মই ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে। প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, “Graduate unemployment is high.” অর্থাৎ উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যেই বেকারত্ব ভয়াবহভাবে বাড়ছে। কারণ শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে বাজারের প্রয়োজনের কোনও সংযোগ নেই। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি বেরোচ্ছে, কিন্তু চাকরি তৈরি হচ্ছে না। এর অর্থ, পাকিস্তানের যুবসমাজ ক্রমশ হতাশা ও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
অর্থনীতির আরেকটি বড় ব্যর্থতা হলো শিল্পখাতের পতন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পাকিস্তান “industrialisation” থেকে “premature deindustrialisation”-এর দিকে চলে গেছে। অর্থাৎ শিল্প গড়ে ওঠার আগেই শিল্পখাত দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে দেশটি উৎপাদননির্ভর অর্থনীতি গড়তে পারেনি, বরং আমদানি ও বাণিজ্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতা। কারণ কোনও দেশ যদি নিজে উৎপাদন না করে কেবল আমদানির উপর নির্ভর করে, তাহলে বৈদেশিক মুদ্রার উপর চাপ বাড়বে এবং অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে টিকতে পারবে না। পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও সেটাই হচ্ছে। কৃষিক্ষেত্রেও উৎপাদন কম, ফলে খাদ্য আমদানি করতে হচ্ছে। অর্থাৎ খাদ্য নিরাপত্তাও ঝুঁকির মধ্যে।
প্রতিবেদনটি পাকিস্তানের করব্যবস্থাকেও তীব্রভাবে আক্রমণ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, করব্যবস্থা সংগঠিত খাতের উপর চাপ বাড়াচ্ছে, অথচ কৃষির মতো বড় খাত কার্যত করের বাইরে রয়ে গেছে। ফলে বিনিয়োগ কমছে এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ দুর্বল হচ্ছে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। অতিরিক্ত সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক জটিলতা ব্যবসা বাড়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ যে খাত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারত, সেই খাতই দমবন্ধ অবস্থায় রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রশাসনিক ব্যর্থতা। প্রতিবেদনে সরাসরি বলা হয়েছে — “Failure of governance and institutions lies at the root of these challenges.” অর্থাৎ সমস্যার মূলেই রয়েছে দুর্বল শাসনব্যবস্থা ও অকার্যকর প্রতিষ্ঠান। সরকার বদলালেই পুরনো প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, নীতি পাল্টে যাচ্ছে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হচ্ছে।
এমনকি একই রাজনৈতিক দলের মধ্যে নেতৃত্ব পরিবর্তন হলেও নীতির হঠাৎ পরিবর্তন হচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীরা পাকিস্তানে বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত মাত্র ১৫ শতাংশে আটকে রয়েছে। অথচ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে এই বিনিয়োগ অনেক বেশি হওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার দুর্বলতাও বড় সমস্যা। বালোচিস্তানের মতো সম্পদসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলিও উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত। কেন্দ্রীয় সরকারের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের কারণে স্থানীয় প্রশাসন কার্যকরভাবে কাজ করতে পারছে না। ফলে আঞ্চলিক অসন্তোষ বাড়ছে।
সব মিলিয়ে ছবিটা অত্যন্ত স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কিছু সাফল্য দেখিয়ে পাকিস্তান হয়তো নিজেকে “মধ্যম শক্তি” হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। কিন্তু বাস্তবে দেশের ভিতরে অর্থনৈতিক দুর্বলতা, বেকারত্ব, শিল্পখাতের পতন, দারিদ্র্য, দুর্বল শিক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক অক্ষমতা ভয়াবহ আকার নিয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো — একটি দেশ কি শুধুমাত্র সামরিক বা কূটনৈতিক সাফল্যের উপর দাঁড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হতে পারে? ইতিহাস বলছে, না। শক্তিশালী অর্থনীতি ছাড়া কোনও দেশ টেকসই প্রভাব বিস্তার করতে পারে না।
আজকের পাকিস্তান সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। একদিকে বৈদেশিক ঋণ ও বিদেশি আমানতের উপর নির্ভরতা, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সংকট ও সামাজিক বৈষম্য। উপর থেকে শক্তিশালী দেখালেও ভিতরে ভিতরে অর্থনীতি ক্ষয়ে যাচ্ছে। আর যদি দ্রুত বাস্তব সংস্কার না করা হয়, তাহলে পাকিস্তানের তথাকথিত “উদীয়মান শক্তি”-র গল্প খুব দ্রুতই অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে পারে।
আর সেই পাকিস্তানের হাত ধরে, নয়া সম্পর্কের লাল কার্পেট বিছানোর চেষ্টা চালাচ্ছে, বাংলাদেশ। আমলাদের প্রশিক্ষণ, সেনাবাহিনীর আধুনিকীকরণ, পড়ুয়াদের জন্য স্কলারশিপ দিচ্ছে পাকিস্তান। আরও কত কী। কী মনে হচ্ছে? বাংলাদেশের ভবিষ্যত কোন পথে? লিখে জানান কমেন্টে।
Geopulse TV
