হামে আক্রান্ত শিশুদের ৬৫ শতাংশই অপুষ্টিতে—সরকারের অবহেলায় বাড়ছে শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি

হাম—শিশুদের জন্য বহু বছর ধরেই পরিচিত একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। টিকা আছে, প্রতিরোধের ব্যবস্থা আছে, চিকিৎসাব্যবস্থাও আছে। তারপরও বাংলাদেশে হাম এখন আবার ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে। আর নতুন এক গবেষণা সামনে এনেছে আরও উদ্বেগজনক তথ্য—হামে আক্রান্ত শিশুদের ৬৫ শতাংশই অপুষ্টিতে ভুগছিল। তাদের মধ্যে ১২ শতাংশ ছিল তীব্র অপুষ্টিতে আর ৫৩ শতাংশ মাঝারি অপুষ্টিতে আক্রান্ত।

অর্থাৎ হাম শুধু শিশুদের শরীরে আঘাত করছে না, অপুষ্টিতে দুর্বল শরীর সেই আঘাত সামলাতেও পারছে না।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং আইসিডিডিআর,বির গবেষণায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৩৫৪ হামে আক্রান্ত শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের ৪৩ শতাংশের বয়স মাত্র ৩ থেকে ৯ মাস। জীবনের যে সময়ে একটি শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য সবচেয়ে বেশি যত্ন, পুষ্টি ও সুরক্ষা প্রয়োজন, সেই বয়সেই তারা হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।

সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্য এসেছে মায়ের বুকের দুধ নিয়ে।

গবেষণায় থাকা শিশুদের ৩৮ শতাংশ জন্মের পর প্রথম ছয় মাস পূর্ণাঙ্গভাবে মায়ের বুকের দুধ পায়নি। আর যারা হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে, তাদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৮২ শতাংশ।

প্রশ্ন হলো—একটি শিশু কেন জীবনের প্রথম ছয় মাস প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হবে? কেন এমন একটি রোগ, যার বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা রয়েছে, সেই রোগে আক্রান্ত হয়ে শিশুকে হাসপাতালে পৌঁছাতে হবে? আর কেন অপুষ্টি, টিকাদান ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি একসঙ্গে মিলিয়ে শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়াবে?

এখানেই সামনে আসে সরকারের স্বাস্থ্যব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি—এমন ৯ মাসের কম বয়সী ১৪৬ শিশুর মধ্যে ১৪২ জনেরই হাম শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ এই বয়সী শিশুদের একটি বড় অংশ হাম নিয়ে হাসপাতালে এসেছে।

অন্যদিকে, টিকা নেওয়ার বয়স হলেও কোনো ডোজ না পাওয়া ১২৬ শিশুর মধ্যে ১২২ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। এক ডোজ টিকা নেওয়া ৪৮ শিশুর মধ্যে ৪৪ জন এবং দুই ডোজ টিকা নেওয়া ২১ শিশুর মধ্যে ১৬ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।

তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—এটি কোনো জাতীয় পর্যায়ের টিকার কার্যকারিতা পরিমাপের গবেষণা নয়। কারণ গবেষণায় শুধু সন্দেহভাজন হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাই দুই ডোজ টিকা নেওয়া শিশুদের ৭৬ শতাংশের হাম শনাক্ত হওয়ার তথ্যকে দেশের সব শিশুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলা যাবে না।

কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়।

যে শিশুদের টিকা পাওয়ার কথা, তারা টিকা পাচ্ছে কি না—সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার?

যে শিশুর পরিবার অপুষ্টির কারণে সন্তানকে পর্যাপ্ত খাবার দিতে পারছে না, সেই পরিবারের কাছে রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সহায়তা কতটা পৌঁছাচ্ছে?

আর যে শিশু জন্মের পর প্রথম ছয় মাস মায়ের বুকের দুধও পর্যাপ্তভাবে পাচ্ছে না, তার পুষ্টি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি চিহ্নিত করতে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কতটা সক্রিয়?

শুধু হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা দেওয়া দিয়ে এই সংকটের সমাধান হবে না।

কারণ একটি শিশু যখন গুরুতর হাম নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছায়, তখন সমস্যাটি অনেক আগেই তৈরি হয়ে গেছে। তার আগে প্রয়োজন ছিল নিয়মিত টিকাদান, অপুষ্টি শনাক্ত করা, মায়েদের সচেতন করা, শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং পরিবারকে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনা।

আর এখানেই সরকারের দায় সবচেয়ে বেশি।

একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ যদি আবার শিশুদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে শুধু আক্রান্ত শিশুর পরিবারের দিকে আঙুল তোলা যায় না। স্বাস্থ্যব্যবস্থার কোথায় ঘাটতি রয়েছে, টিকাদান কর্মসূচিতে কোথায় দুর্বলতা রয়েছে, অপুষ্টি মোকাবিলায় সরকারি কর্মসূচি কতটা কার্যকর—এসব প্রশ্নের জবাবও দিতে হবে।

বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারগুলোর শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। পরিবারের আয় কম হলে শিশুর পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা কঠিন হয়। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়া, পরীক্ষা করানো কিংবা সময়মতো চিকিৎসা নেওয়াও অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে শিশুর অসুস্থতা অনেক সময় জটিল পর্যায়ে গিয়ে ধরা পড়ে।

আর এই বাস্তবতার মধ্যেই যদি টিকাদান ও পুষ্টি কর্মসূচিতে কোনো ধরনের গাফিলতি থাকে, তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় শিশুদের।

গবেষণার আরেকটি তথ্যও তাই সরকারকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করার মতো। দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও কিছু শিশুর মধ্যে হাম শনাক্ত হয়েছে। গবেষকেরা এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি না হওয়া, সময়ের সঙ্গে অ্যান্টিবডির সুরক্ষা কমে যাওয়া, অপুষ্টি কিংবা ব্যক্তিভেদে অন্যান্য কারণের কথা বলেছেন। তবে কোন কারণটি দায়ী, তা এই গবেষণায় নিশ্চিত করা হয়নি।

অর্থাৎ এখানে অনুমান নয়, দরকার আরও গবেষণা।

দরকার টিকাদান কর্মসূচির বাস্তব চিত্র যাচাই করা। কোথায় শিশু টিকা থেকে বাদ পড়ছে, কেন বাদ পড়ছে, টিকার আওতা কতটা কার্যকর এবং দুই ডোজ নেওয়ার পরও আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে কী ঘটছে—এসব প্রশ্নের উত্তর বের করা জরুরি।

কারণ সরকারের কাজ শুধু রোগের সংখ্যা প্রকাশ করা নয়; রোগ কেন বাড়ছে, সেটিও খুঁজে বের করা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—শিশুদের অপুষ্টি কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়। অপুষ্ট শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। ফলে হামসহ বিভিন্ন সংক্রমণ তাদের জন্য আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

আজ যে ৩৫৪ শিশু হাসপাতালের গবেষণায় এসেছে, তাদের প্রত্যেকের পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একজন মা-বাবা এবং একটি ভবিষ্যৎ।

কিন্তু যদি টিকা, পুষ্টি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক বিষয়গুলোতেই ঘাটতি থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—রাষ্ট্র আসলে তার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের কতটা সুরক্ষা দিতে পারছে?

হাম প্রতিরোধযোগ্য। শিশুমৃত্যুও অনেকাংশে প্রতিরোধযোগ্য। তাই কোনো শিশুর মৃত্যু যেন শুধু একটি পরিসংখ্যান হয়ে না থাকে।

সরকারের এখন প্রয়োজন দায় এড়িয়ে যাওয়ার পরিবর্তে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা খতিয়ে দেখা। টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা চিহ্নিত করা, অপুষ্ট শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করা, মায়েদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া এবং হাসপাতালের বাইরে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা।

কারণ হাসপাতালে বেড বাড়ানো সমাধানের শেষ ধাপ। আসল সমাধান হলো—শিশুকে যেন হাম নিয়ে সেই হাসপাতালে আসতেই না হয়।

এখন প্রশ্ন একটাই—আর কত শিশু হাসপাতালে পৌঁছালে সরকার বুঝবে, হাম শুধু একটি রোগের সংকট নয়; এটি দেশের টিকাদান, পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা?

About Desk 1

Check Also

অলি আহমদকে পরাজিত করে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

ঢাকা: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশটির ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *